ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ডাকসু, চাকসুসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের সাফল্যে জোটের ভেতরে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। তবে চূড়ান্ত ফলাফলে জামায়াত এককভাবে ৭১টি এবং জোটগতভাবে মোট ৮০টি আসনে জয় পেয়েছে। প্রত্যাশিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় জোটের ভেতরে-বাইরে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যালোচনায় মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আমিরের সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরে সেখানে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের বৈঠকও হয়। জোট সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফল বিশ্লেষণ ও ত্রুটি চিহ্নিত করতেই এসব বৈঠক আয়োজন করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত জোটের এই ফলাফল বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। তবে চারটি প্রধান কারণে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি বলে জোটের নেতারা মনে করছেন—সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটারদের প্রত্যাশিত সমর্থন না পাওয়া, আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশের ভোট বিএনপির দিকে চলে যাওয়া, হেফাজতে ইসলাম ও আলেমদের একটি অংশের বিরোধিতা এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ইস্যু। এর পাশাপাশি দলীয় আমির শফিকুর রহমান–এর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি বিতর্কিত পোস্টও নির্বাচনী পরিবেশে প্রভাব ফেলেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে শফিকুর রহমান ভোটারদের শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে ফল ঘোষণা প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি দাবি করেন, অনেক জায়গায় তাদের প্রার্থীরা অল্প ব্যবধানে ‘রহস্যজনকভাবে’ পরাজিত হয়েছেন এবং ফলাফলে গরমিল রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের বেসরকারি ফল অনুযায়ী, জামায়াত এককভাবে ৭১টি আসনে জয়লাভ করে আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে। জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পেয়েছে ৬টি আসন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস পেয়েছে ২টি এবং খেলাফত মজলিস পেয়েছে ১টি আসন। উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, সীমান্তবর্তী ও উপকূলীয় জেলাগুলোতে জোট প্রার্থীরা ভালো ফল করেন। তবে খুলনা-৫ আসনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার–সহ অন্তত ১০ জন হেভিওয়েট নেতা পরাজিত হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, নারী, তরুণ ও নতুন ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের সমর্থন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোর প্রচার, সংগঠিত তৃণমূল নেটওয়ার্ক এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মীবাহিনী এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে ইসলামপন্থি দলগুলোর বিভাজন নিরসনের চেষ্টা এবং জোটবদ্ধ নির্বাচনী কৌশল তাদের ভোট বাড়াতে সহায়ক হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক স ম আলী রেজা মনে করেন, জামায়াত একটি বিকল্প রাজনৈতিক ঢেউ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তার মতে, এনসিপি স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারলে আরও ভালো ফল করতে পারত। অন্য বিশ্লেষকরাও বলছেন, দীর্ঘ দমন-পীড়নের পর ২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াত নিজেদের নতুনভাবে উপস্থাপন করেছে এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরেছে, যা ভোট বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।
জোটের শরিক খেলাফত মজলিস–এর যুগ্ম মহাসচিব আব্দুল জলিল অভিযোগ করেন, বিচ্ছিন্ন সহিংসতা ছাড়া নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হলেও ফল ঘোষণায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, যা গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে, প্রত্যাশিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন না করলেও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের আসন ও ভোট বৃদ্ধিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।