মো. হাবিবউল্লাহ (১২) নামের এক মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো রহস্য উদঘাটন হয়নি। এ নিয়ে জনমনে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত না হলে প্রকৃত সত্য চাপা পড়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে। নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়ায় বিচার প্রক্রিয়ায় শৈথিল্য দেখা যাচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
গত ১৩ জানুয়ারি বিকেলে কালিয়াকৈর বাইপাস এলাকায় অবস্থিত আল আবরার ইন্টারন্যাশনাল হিফজ মাদরাসার টয়লেট থেকে হাবিবউল্লাহর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, প্রতিদিনের মতো পড়াশোনার সময় বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে সে টয়লেটে যায়। দীর্ঘ সময় পার হলেও ফিরে না আসায় শিক্ষকরা বিষয়টি লক্ষ্য করেন। পরে নিরাপত্তাকর্মীকে দিয়ে দরজায় ডাকাডাকি করা হয়। কোনো সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে ভেন্টিলেশনের সঙ্গে তোয়ালে পেঁচানো অবস্থায় তার ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পাওয়া যায়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।
নিহত হাবিবউল্লাহ যশোরের কেশবপুর উপজেলার বাসিন্দা হামিদুল ইসলামের ছেলে। সে ওই মাদ্রাসার হিফজ বিভাগের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিল। পরিবার ও সহপাঠীদের তথ্যমতে, সে কিছুদিন ধরে মাদ্রাসায় থাকতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছিল এবং বাড়ি যেতে চাইত। সহপাঠীরা অভিযোগ করেছে, মাদ্রাসাটিতে শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় এবং বাড়ি যেতে চাইলে অনেক সময় অনুমতি দেওয়া হয় না। নিহত হাবিবউল্লাহ তার মাকেও জানিয়েছিল যে, সে আর ওই মাদ্রাসায় থাকতে চায় না। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে পুনরায় মাদ্রাসায় পাঠানো হয়েছিল বলে সহপাঠীরা দাবি করেছে।
ঘটনার তদন্ত নিয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার নাসীর উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করলেও তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সাংবাদিকদের সঙ্গে তার কথোপকথনকে অপেশাদার বলে আখ্যা দিয়েছেন স্থানীয়রা। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আপনার কি সমস্যা? পরিবারের কাছে জিজ্ঞেস করেন।” দায়িত্বশীল এক তদন্ত কর্মকর্তার এমন প্রতিক্রিয়া নতুন করে রহস্য ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গাজীপুর জেলাজুড়ে নামে-বেনামে গড়ে উঠেছে বহু মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেগুলোর অনেকই যথাযথ নিয়ম-কানুন না মেনে পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে তদারকির অভাব থাকায় শিক্ষার্থীরা নানা ঝুঁকির মধ্যে থাকে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নজরদারি না থাকায় এমন ঘটনা বারবার ঘটলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সচেতন মহল আশঙ্কা করছে, ঘটনাটি যদি অপমৃত্যু হিসেবে শেষ করা হয় তবে প্রকৃত দোষীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাবে এবং গোপন লেনদেনের মাধ্যমে মামলা ভিন্ন খাতে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে ভবিষ্যতে অপরাধ প্রবণতা আরও বাড়তে পারে বলেও তারা মনে করছেন। তাদের ভাষ্য, একটি শিশুর অস্বাভাবিক মৃত্যু কোনোভাবেই রহস্যে ঢাকা থাকতে পারে না।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংশ্লিষ্ট সুপারের ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো তদন্ত কমিটি বা শক্ত পদক্ষেপের তথ্য পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসী ও স্বজনদের একটাই দাবি, এই মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা হোক এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা হোক। তাদের মতে, সত্য উদঘাটন না হলে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজের আস্থা নষ্ট হবে এবং ভবিষ্যতে আরও শিক্ষার্থী ঝুঁকির মুখে পড়বে।