বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪২ পূর্বাহ্ন
বিশেষ প্রতিনিধি:
আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ বলে কিছু আছে কি না, তা নিয়ে রূপকথায় বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু কুমিল্লার লাকসাম-মনোহরগঞ্জের মানুষ জানে, মো. তাজুল ইসলামের জন্য এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ই ছিল সেই চেরাগ। ক্ষমতার অপব্যবহার, কমিশন বাণিজ্য ও আত্মীয়কেন্দ্রিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। সে আত্মঅহমীকায় নিজেকে পরিণত করেছে ‘দানবীয় স্যার’-এ। স্যার না ডাকলে খুব মাইন্ড করতেন। এলাকার মানুষ স্যার ডাকতে ডাকতে ভুলেই গিয়েছিল তার আসল নাম। তাকে স্যার না-ডাকলে কোনো কথায় শুনতে নারাজ ছিলেন।
তাজুল ইসলাম এমপির পদে বসেই বিস্তার করতে থাকেন নিজের সাম্রাজ্য। গড়ে তোলেন নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী। ২০০৮ সালে দ্বিতীয়বারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি। নিজেকে ভাবতে শুরু করেন লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ উপজেলার একক অধিপতি। ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর এলজিআরডি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। মন্ত্রিত্ব পেয়েই আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। মন্ত্রিত্ব পাওয়ার পর তাজুল লুটপাট আর অবৈধ সম্পদ অর্জনের খেলায় মেতে ওঠেন। দেশ-বিদেশে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়েছেন। দুর্নীতি, অনিয়ম ও সীমাহীন ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন তিনি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দলগুলোর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাদের কোণঠাসা করে দাবিয়ে রাখার হোলিখেলায় মেতে ওঠেন তিনি। ক্ষমতার পালাবদলে যেখানে আওয়ামীলীগ বিলিন হয়েছিল তাজুল লীগে।
ক্ষমতার শীর্ষে বসে কীভাবে সম্পদের বহুগুণ বৃদ্ধি, প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক দখল, পাহাড়ি জমি কব্জা এবং ‘পাঁচ পান্ডব’ নামে পরিচিত ঘনিষ্ঠ বলয় দিয়ে একটি অঞ্চলে ভীতির রাজত্ব কায়েম করা যায়—তার এক বিতর্কিত উদাহরণ হয়ে উঠেছেন তিনি।
সরকার পতনের পর তাজুলসহ সিন্ডিকেটের সদস্যরা পালিয়ে গেলে রয়ে যায় তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ। তাজুলসহ তার সহযোগীদের অবৈধ্য সম্পদগুলোর তদারকীও করছেন বর্তমান নেতারা। সেই তাজুল সিন্ডিকেটের উত্থান ও সাম্রাজ্যের নেপথ্যের অন্ধকার জগত নিয়ে ৫ পর্বের ধারাবাহীক প্রতিবেদনের এবার থাকছে ১ম পর্ব…
হলফনামার অঙ্কেই ২৪২ গুণ সম্পদ বৃদ্ধি:
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৮ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে মো. তাজুল ইসলাম–এর সম্পদ বেড়েছে প্রায় ২৪২ গুণ।
২০১৪ সালের নির্বাচনী হলফনামায় তার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৬ কোটির কিছু বেশি। ২০১৮ সালে তা দাঁড়ায় ৪৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। আর ২০২৪ সালের ঘোষণায় সম্পদের পরিমাণ ছাড়িয়ে যায় ১১৮ কোটি টাকা। প্রশ্ন উঠেছে—একজন রাজনীতিকের ঘোষিত বার্ষিক আয় প্রায় ৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা হলে চার বছরের ব্যবধানে সম্পদ দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ে কীভাবে?
অভিযোগ রয়েছে, এলজিআরডি মন্ত্রী থাকাকালে স্থানীয় সরকার বিভাগ, এলজিইডি, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, জেলা পরিষদ, উপজেলা ও পৌরসভায় উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে ‘নির্দিষ্ট শতাংশ’ কমিশন নেওয়া হতো। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বড় প্রকল্পে ৫–১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশনের অলিখিত নিয়ম চালু ছিল।
এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার ও তার পরিবারের সম্পদের তথ্য চেয়ে নোটিশ দেয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তথ্য না দেওয়ায় তদন্ত আরও জোরদার হয়।
এছাড়া বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তার ও পরিবারের ব্যাংক হিসাব তলব করে এবং একাধিক হিসাব সাময়িক স্থগিতের নির্দেশ দেয়। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ধারা উল্লেখ করে ৩০ দিনের জন্য লেনদেন স্থগিত করা হয়।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, “ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সম্পদের এই অসামঞ্জস্য গভীর অনুসন্ধানের দাবি রাখে।”

‘পাঁচ পান্ডব’ ও কমিশন সাম্রাজ্য
স্থানীয়দের ভাষায়, মন্ত্রীর ‘পাঁচ পান্ডব’ ছিল—যারা মাঠপর্যায়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করত। তাজুলের ভাতিজা আমিরুল ইসলাম, যুবলীগ নেতা শাহাদাত হোসেন, ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) কামাল হোসেন, সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) জাহিদ হোসেন এবং শ্যালক মহব্বত আলীর নাম।
ওই পঞ পান্ডরে তান্ডবে আওয়ামী লীগের পুরোটা সময় তটস্থ ছিল লাকসাম ও মনোহরগঞ্জবাসী। আয়নাঘর বানিয়ে নির্যাতন করে টাকা আদায়, টেন্ডারবাজি ও জোর-জুলুম করে জমি দখলসহ নানাভাবে হয়রানি করাই ছিল তাদের কাজ। এসব অনৈতিক কাজে নেতৃত্ব দিতেন মন্ত্রীর ভাতিজা সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম ও যুবলীগ নেতা শাহাদাত হোসেন, ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মো. কামাল হোসেন, সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) জাহিদ হোসেন ও মন্ত্রীর শ্যালক উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মহব্বত আলী। অনৈতিক কাজ করে তারা এখন বিশাল সম্পদের মালিক। তবে গত ৫ আগস্টের পর থেকে এই জুলুমবাজদের আর প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না।তাদেরকে অতিদ্রæত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন এলাকার জনগন। তাদেরকে কঠোর সাজা নিশ্চিতের কথা বলেন তারা।
পিএস কামালের বিরুদ্ধে দুদক ৯ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা করে। তদন্তে ১৫ কোটির বেশি সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়, যার বড় অংশের বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি।
লাকসামের ‘আয়নাঘর’ ও টর্চার সেল
তাজুল ইসলামের শাসনামল ছিল ভয়ের রাজত্ব। লাকসাম থানার সামনে মহব্বত আলীর ব্যবসায়িক অফিস ছিল মূলত একটি টর্চার সেল বা ‘আয়নাঘর’। সেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সাধারণ মানুষকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হতো এবং জমি লিখে দিতে বাধ্য করা হতো। কাউন্সিলর বাচ্চু ও মুন্সীর কার্যালয়গুলো ছিল এই জল্লাদখানার শাখা। তাজুলের আশীর্বাদপুষ্ট এই গুন্ডা বাহিনী লাকসামের কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের শত কোটি টাকার সম্পদ নামমাত্র মূল্যে নিলামের নাটক করে দখল করে নেয়। মানুষকে ‘স্যার’ ডাকতে বাধ্য করা এই ‘দানব’ মন্ত্রী আসলে নিজ এলাকায় এক ভয়ংকর ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন।
মন্ত্রীপত্নী ফৌজিয়ার সম্পদের ছায়া: পাহাড় দখল ও ৩০৪ একর জমি ক্রোক:
শুধু নিজের নয়—স্ত্রীর নামেও বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। ফৌজিয়া ইসলাম–এর নামে বান্দরবানের লামা উপজেলায় ইজারা ও বায়না দলিলে ৩০৪ দশমিক ৫৯ একর জমি জব্দ (ক্রোক) করার আদেশ দেন আদালত।
ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের আদেশে ব্যাংক হিসাব ও ১৪টি কোম্পানির শেয়ার ফ্রিজ করা হয়। ব্যাংক হিসাবে পাওয়া যায় ১ কোটি ৪২ লাখ টাকার বেশি এবং শেয়ারের মূল্য ৩ কোটিরও বেশি।
দুদকের আবেদনে বলা হয়েছে, ৬ কোটি ৯০ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ২৭ কোটির বেশি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বান্দরবানের লামার সরই ইউনিয়নের আন্দারীর ফুইট্টার ঝিরি এলাকায় প্রায় ১০০ পরিবার অভিযোগ করেছে—স্থানীয় না হয়েও কীভাবে এত জমি কেনা ও দখল সম্ভব হলো? ভুক্তভোগীদের দাবি, এক হাত কিনে দশ হাত দখল করা হয়েছে। মসজিদ, কবরস্থান, চলাচলের রাস্তা পর্যন্ত দখলের অভিযোগ আছে।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া পাহাড়ি পরিবারগুলোর বক্তব্য—“আমরা ৫০ বছর ধরে জুম চাষ করছি। এখন নিজের জমিতে কাজ করতে গেলেই হুমকি আসে।”
দুদকে জমা অভিযোগে বলা হয়েছে, ভুয়া দলিলের মাধ্যমে ৫০০ একরের বেশি জমি বেদখল করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
স্বামীর ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি বান্দরবানের লামার সরইতে প্রায় ৫০০ একর জমি জবরদখল করেছেন। স্থানীয় পাহাড়ি ও বাঙালি পরিবারগুলোকে অস্ত্রের মুখে উচ্ছেদ করে গড়ে তুলেছেন বিশাল বাংলো বাড়ি ও খামার। এমনকি মসজিদ ও কবরস্থানের জায়গাও রেহাই পায়নি এই রাক্ষুসে ক্ষুধা থেকে। সম্প্রতি আদালতের নির্দেশে তার নামে থাকা ৩০৪ একর জমি ক্রোক করা হয়েছে এবং ১২টি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয়েছে। বান্দরবানের বাসিন্দারা তাকে ‘ভূমিদস্যু’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে রাজপথে মানববন্ধনে অংশ নিয়েছেন, যা একজন মন্ত্রীর স্ত্রীর জন্য চরম লজ্জাজনক।
‘দানবীয় স্যার’ এখন দেশান্তরী
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে যখন শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে, তার আগেই ৩ আগস্ট সুকৌশলে দেশ ছাড়েন তাজুল ইসলাম। তার অবর্তমানে বিক্ষুব্ধ জনতা লাকসাম ও মনোহরগঞ্জের আলিশান বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। যে বাড়িতে বসে তিনি মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতেন, আজ তা কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার স্বজন ও সহযোগীরা এখন আত্মগোপনে থাকলেও তাদের ব্যাংক হিসাব ও স্থাবর সম্পদ জব্দের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষায়—“দেড় যুগ পর মুক্তি।”
তদন্ত সূত্র জানায়, তিনি ৩ আগস্ট দেশ ছাড়েন। বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছেন তা নিশ্চিত নয়।
আইনের কাঠগড়ায় ‘দানবীয় স্যার’?
মো. তাজুল ইসলাম–এর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তা হবে বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ইতিহাসে অন্যতম বড় কেলেঙ্কারি।
অন্যদিকে, আইনের দৃষ্টিতে অভিযোগ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি অভিযুক্ত, দোষী নন—এই নীতি সমানভাবে প্রযোজ্য।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—হলফনামার অঙ্ক, আদালতের জব্দ আদেশ, ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ, পাহাড়ি পরিবারের মানববন্ধন এবং স্থানীয় জনরোষ—সব মিলিয়ে একটি প্রশ্ন এখন জাতীয় আলোচনায়:ক্ষ মতা কি উন্নয়নের জন্য, নাকি ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য গড়ার জন্য?
দুদকের তদন্ত শেষ পর্যন্ত কী ফল বয়ে আনে—সেই দিকেই এখন তাকিয়ে আছে লাকসাম–মনোহরগঞ্জবাসী, আর পুরো দেশ।