বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬, ০৭:১১ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রশ্নবিদ্ধ শিক্ষাসনদ, অবৈধ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি এবং নিয়োগে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ—এমন নানা বিতর্কের মধ্যেই বীমা খাতের একটি শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করছেন প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মুহাম্মদ সাইদুল আমিন। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তার নামে দুটি ভিন্ন উৎসের শিক্ষাসনদ রয়েছে—একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এবং অন্যটি বিতর্কিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা থেকে। সনদ দুটির তথ্য বিশ্লেষণ করে খাত সংশ্লিষ্টদের অনেকেই বলছেন, এতে গুরুতর অসংগতি রয়েছে এবং সেগুলোর সত্যতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তৎকালীন সরকারি জগন্নাথ কলেজ থেকে ১৯৯৪-৯৫ সেশনে রসায়ন বিভাগে স্নাতক (অনার্স) সম্পন্ন করার একটি সনদ রয়েছে সাইদুল আমিনের নামে। ওই সনদ অনুযায়ী তিনি ১৯৯৭ সালে পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন এবং সনদটি ইস্যু করা হয় ২০০০ সালের ৪ জানুয়ারি। কিন্তু একই সেশনে তার নামে আবার স্নাতকোত্তর ডিগ্রিরও একটি সনদ পাওয়া গেছে। সেই সনদে উল্লেখ রয়েছে, তিনিও একই ১৯৯৪-৯৫ সেশনে ভর্তি হয়ে রসায়ন বিভাগে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে তিনি ১৯৯৮ সালে পরীক্ষা দিয়ে ২০০১ সালে পাস করেন। অথচ শিক্ষাবিদদের মতে, একই সেশনে কোনো শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় ডিগ্রি অর্জন করা বাস্তবসম্মত নয়। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একজন শিক্ষার্থী একই সেশনে অনার্স এবং মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার সুযোগই নেই। ফলে এই ধরনের সনদের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ হওয়াটা স্বাভাবিক।
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন দাবি করেছেন সাইদুল আমিন। তার বক্তব্য, তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো ডিগ্রি নেননি এবং সেখানে পড়াশোনাও করেননি। তিনি বলেন, তার একমাত্র উচ্চশিক্ষা হলো দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা থেকে অর্জিত বিবিএ ও এমবিএ ডিগ্রি। তিনি দাবি করেন, দীর্ঘ সময় শুধু এসএসসি ও এইচএসসি সনদ দিয়েই চাকরি করেছেন এবং পরে ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। কিন্তু এখানেও নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে। কারণ, দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আলোচিত। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রশাসনিক অনিয়ম, আইন অমান্য এবং মানহীন শিক্ষাব্যবস্থার অভিযোগে ২০০৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পরিচালক ওমর ফারুক জানিয়েছেন, এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বর্তমানে অনুমোদিত নয় এবং এখান থেকে দেওয়া সনদ ব্যবহার করে চাকরি করার সুযোগ নেই।

সাইদুল আমিনের নামে পাওয়া ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তিনি ২০০১ সালে মার্কেটিং বিভাগ থেকে বিবিএ পাস করেছেন এবং তার সিজিপিএ ছিল ৪-এর মধ্যে ৩ দশমিক ৪৮। এই সনদটি ইস্যু করা হয় ২০০২ সালের ২৩ জানুয়ারি। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ২০০২ সালে এমবিএ সম্পন্ন করেন বলে সনদে উল্লেখ রয়েছে, যেখানে তার সিজিপিএ ৩ দশমিক ৬৩। তবে এই সনদটি ইস্যু করা হয়েছে ২০০৪ সালের ২৩ জানুয়ারি। সনদ দুটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষ করে রোল নম্বর এবং কিছু তথ্য অস্পষ্ট থাকায় সেগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিষয়টি সামনে আসার পর বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সাইদুল আমিনের শিক্ষাসনদ যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে তার পূর্ববর্তী কর্মস্থল ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং হোমল্যান্ড ইসলামি লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠিয়ে তার নিয়োগের সময় জমা দেওয়া সব শিক্ষাসনদ ও জীবনবৃত্তান্তের কপি পাঠাতে বলা হয়েছে। আইডিআরএর একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং যাচাই প্রক্রিয়া শেষ হলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
এদিকে অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সাইদুল আমিন পূর্ববর্তী কর্মস্থলগুলোতেও নানা বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে দায়িত্ব পালনকালে তার শিক্ষাসনদ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে তাকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, সিইও পদে অনুমোদন পাওয়ার জন্য তিনি প্রায় ৪০ লাখ টাকা লেনদেন করেছিলেন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে। এমন অভিযোগ তুলে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও চিঠি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা। যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষ নিশ্চিত বক্তব্য দেয়নি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সাইদুল আমিন অবশ্য সবকিছুই অস্বীকার করেছেন। এক লিখিত প্রতিবাদে তিনি দাবি করেন, একটি কুচক্রী মহল তার এবং প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সুনাম ক্ষুণ্ন করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন বীমা খাতে সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন এবং বীমা আইন ও আইডিআরএর সব নিয়ম মেনেই কাজ করছেন। তিনি আরও বলেন, তার নেতৃত্বে কোম্পানি গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকার বীমা দাবি পরিশোধ করেছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই প্রগ্রেসিভ লাইফ গ্রাহকদের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
তবে বীমা খাত সংশ্লিষ্টদের অনেকেই বলছেন, এতসব অসংগতি এবং বিতর্কের মধ্যেও কীভাবে একজন ব্যক্তি একটি তালিকাভুক্ত বীমা কোম্পানির প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মতে, সনদের সত্যতা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। এখন সবার নজর আইডিআরএর যাচাই প্রক্রিয়ার দিকে—কারণ সেই তদন্তের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে সাইদুল আমিনের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং তার নিয়োগ নিয়ে চলমান বিতর্কের চূড়ান্ত পরিণতি।

দীর্ঘ বছর ধরে জমে থাকা প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও আর্থিক অস্বচ্ছতা নিয়ে- অনুসন্ধানের প্রথম পর্বের মাধ্যমে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল এক ভয়াবহ বাস্তবতার সূচনা মাত্র। ৪ পর্বের ধারাবাহিক সংবাদের দ্বিতীয় পর্বে আসছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য—অপেক্ষায় থাকুন।
– প্রিয় পাঠক, আপনার কাছেও যদি প্রতিষ্ঠানটির কোনো তথ্য থাকে, আমাদের সঙ্গে শেয়ার করুন।