বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:০৬ অপরাহ্ন
সাম্প্রতিক সময়ে ‘বাহাত্তরের সংবিধান’ বাতিল বা পরিবর্তনের বিষয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই প্রসঙ্গে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুরনো একটি বক্তব্যও আবার আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা দাবি করছেন যে খালেদা জিয়াও সংবিধান ‘ছুড়ে ফেলার’ কথা বলেছিলেন। তবে এই বক্তব্যের প্রকৃত প্রেক্ষাপট নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা আছে।
কিছু রাজনৈতিক দল ও তরুণ নেতারা সম্প্রতি বাহাত্তরের সংবিধান বাতিল বা নতুন সংবিধান প্রণয়নের দাবি জোরালো করেছেন। এ নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রশ্ন তোলেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান পার্থ।
পার্থ বিরোধী দলগুলোর উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন, “সংবিধান কেন ছুঁড়ে ফেলব? সংবিধান কি মনে করিয়ে দেয় যে এটা একাত্তরের পরাজয়ের দলিল? সংবিধান নিয়ে এত গাত্রদাহ কেন?”
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, “বাহাত্তরের সংবিধান লাখো শহীদের রক্তের ঋণ ও লাখো মা-বোনের সম্ভ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এই সংবিধানকে সামনে রেখেই যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।”
এর আগে ২৯ মার্চ জাতীয় সংসদে আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, “জেন-জি’রা আর বাহাত্তরের সংবিধান চায় না।” পরদিন জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “যে সংবিধান খালেদা জিয়া ছুড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন, সেই সংবিধানের প্রতি সরকারি দলের এত সমর্থন কেন, জনগণ জানতে চায়।”
এরপর মঙ্গলবার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের আলোচনায়, জামায়াত ও এনসিপির আরও অনেক সংসদ সদস্য একই সুরে মন্তব্য করেন। তারা বিএনপিকেও প্রশ্ন করেন—যে সংবিধান খালেদা জিয়া নাকি বাতিল করতে চেয়েছিলেন, তার প্রতি এখন কেন সমর্থন।
৩১ মার্চ কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “সংসদ সদস্য পার্থ যখন বললেন, সংবিধান ছুঁড়ে ফেলতে চাওয়াদের স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে অ্যালাইনমেন্ট করছেন, তখন সরকারি দলের মন্ত্রীরা টেবিল চাপ দিয়ে সমর্থন জানালেন। খালেদা জিয়া, যিনি গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন সংগ্রাম করেছেন, তিনি বলেছেন—‘যখন জনতার সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, সেদিনই সংবিধান ছুড়ে ফেলা হবে।’ এই বক্তব্যের পর, ট্রেজারি বেঞ্চে যারা দীর্ঘদিন বেগম জিয়ার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন, তারা যদি সংবিধান ছুড়ে ফেলার সঙ্গে স্বাধীনতা বিরোধীদের অ্যালাইনমেন্টের হাততালিতে অংশ নেন, তাহলে সেটা বেগম জিয়াকে অপমান করার সমতুল্য কি না, তা তারা ভাববেন।”
আসলে কী বলেছিলেন খালেদা জিয়া
২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের সময় বিএনপি তার বিরোধিতা করেছিল। সেই বছরের ১৩ জুলাই এক গণঅনশন কর্মসূচিতে খালেদা জিয়া বলেন, “আওয়ামী লীগ আজীবন ক্ষমতায় থাকার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ বিভিন্ন সংশোধনী এনেছে। আমরা বলতে চাই, এসব সংশোধনী হলো আওয়ামী ইশতেহার। জনগণ তা মানে না। আগামী সরকার পরিবর্তনের পর এসব সংশোধনী বাতিল করা হবে।”
বিশ্লেষকরা মনে করান, এখানে তিনি পুরো সংবিধান নয়, বরং নির্দিষ্ট কিছু সংশোধনী বাতিলের কথাই উল্লেখ করেছিলেন।
এ বিষয়ে যখন আওয়ামী লীগ বিতর্ক তৈরি করতে থাকে, তখন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য প্রয়াত মওদুদ আহমদ বলেন, “সংবিধান ছুঁড়ে ফেলা হবে বা গ্রহণযোগ্য নয়—খালেদা জিয়ার এ অভিপ্রায় বোঝায়, তার দল ক্ষমতায় এলে পঞ্চদশ সংশোধনী পরিবর্তন করবে।”
সুতরাং, তথ্য অনুযায়ী, খালেদা জিয়া সরাসরি পুরো সংবিধান বাতিলের কথা বলেননি; তিনি নির্দিষ্ট সংশোধনীগুলো বাতিল করার কথাই বলেছেন। ফলে তার বক্তব্যকে পুরো সংবিধান ‘ছুঁড়ে ফেলার’ আহ্বান হিসেবে দেখানো কতটা সঠিক, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।