বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৯ পূর্বাহ্ন
লিখেছেন হানিফ মোহাম্মদ:
ব্যক্তিজীবনে একজন সফল চিকিৎসক, বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজের স্বনামধন্য অধ্যক্ষ (অব.) ভাস্কর সাহা মন ও মননে একজন সাধক কবি। মানুষ হিসেবে তিনি চমৎকার, পরোপকারী ও মিশুক। একজন মানবিক চিকিৎসক হিসেবে বরিশাল শহরে তার পরিচিতি সুপ্রতিষ্ঠিত। ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র নাড়ির টানে তিনি সারাজীবন কাটিয়ে দিয়েছেন বরিশালের মতো মফস্বল শহরেই। বিদেশে মাইগ্রেশনের চিন্তা তো দূরের কথা, বরিশালের বাইরে স্থায়ী হওয়ার কথাও তিনি ভাবেননি। অথচ এই নির্বিরোধী মানুষটিকেও নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে মাঝে মাঝে কুৎসা রটানো হয়—যা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর ও বেদনাদায়ক।
এই প্রেক্ষাপটে তার কবিতা ‘এইদিন সেইদিন’ নতুন করে পাঠকের আলোচনায় উঠে এসেছে। কবিতাটি মূলত স্মৃতিকাতরতা, একাকীত্ব এবং হারিয়ে যাওয়া মমতার এক গভীর আরশি। বছরের একটি বিশেষ দিনকে কেন্দ্র করে কবি তার বর্তমানের শূন্যতাকে অতীতের পূর্ণতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন।
কবিতার শুরুতেই কবির এক অদ্ভুত আনমনা ভাব ধরা পড়ে—
“এই দিনটাতে কেমন যেনো আনমনা হয়ে যাই।
দুর থেকে হঠাৎ আলো এসে পিছলে দেয় চোখ।
কিছু শব্দ এসে ভীড় করে শুন্য চারপাশ।”
এই কয়েকটি পংক্তিতেই তৈরি হয় এক ধোঁয়াটে মানসিক আবহ, যেখানে বাইরের জগৎ উপস্থিত থাকলেও ভেতরে বিরাজ করে শূন্যতা। এরপরই প্রকৃতির এক প্রাণবন্ত চিত্র—
“বাইরে চড়া রোদের হাতছানি-
ভাঙছে সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে।
জামরুল গাছটাতে ছোট ছোট পাখিদের হাট।
ভীষণ কিচির মিচির।”
চারপাশে জীবন চলমান, প্রকৃতি উচ্ছ্বসিত; কিন্তু সেই উচ্ছ্বাস কবির অন্তরে পৌঁছায় না। এই বৈপরীত্যই কবিতার আবেগকে গভীর করে তোলে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কবি যখন দেখেন পরিচিত মানুষের দৈনন্দিন জীবন, তখনও তার নিজের ভেতরের অস্থিরতা কাটে না—
“জানালায় মুখ বাড়াতেই কিছু চেনা মানুষের প্রাত্যহিকতার ছবি।
স্নানের বেলা যায় তবুও ভাবি।
ভাবি এলোমেলো পথ।”
এই এলোমেলো ভাবনার ভেতরেই হঠাৎ এসে উপস্থিত হয় জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতা—মায়ের অনুপস্থিতি—
“এমন দিনে মা তুমি নেই।
কে আর বলে তাড়াতাড়ি উঠে পড় খোকা।
স্নান সেরে ছাতু উড়াতে যাবি।”
এই অংশে মায়ের স্মৃতি কবিতার কেন্দ্রীয় বেদনাকে স্পষ্ট করে। শৈশবের সেই পরিচিত ডাক, যত্ন আর অভ্যাস আজ আর নেই। ফলে বছরের শেষ দিনে নতুনকে বরণ করার বদলে কবি আটকে পড়েন অতীতের স্মৃতিতে।
“সেদিন বুঝিনি এতো ছাতু শুধু নয় পুরোনো সব ব্যাথার জঞ্জাল।
নতুনকে বাধতে হবে তারে।”
এই উপলব্ধিতে ধরা পড়ে সময়ের নির্মমতা। একসময় যে বিষয়গুলো ছিল নিছক আনন্দ, আজ তা হয়ে উঠেছে বেদনার ভার। প্রকৃতিও যেন এখানে নীরব দর্শক নয়, বরং সক্রিয় এক চরিত্র—
“গানের স্বরলিপি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সার সার পলাশ শিমুল।
কৃষ্ণচূড়ার লালেও কলহাস্য।
সম্ভাষণ।”
প্রকৃতির এই হাসি, সম্ভাষণ—সবই যেন কবিকে আহ্বান জানায়, কিন্তু তিনি সাড়া দিতে পারেন না। বরং নিজেকে প্রশ্ন করেন—
“মুখ ফিরিয়ে থাকি কি করে?
কি করে বলি ভালো নেই?”
আধুনিক জীবনের একাকীত্বও কবিতায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—
“মুঠোফোনে তোমাকে খুঁজতেই এনগেজড।
আর মনে করো না।”
প্রযুক্তির এই যুগেও মানুষের ভেতরের শূন্যতা কতটা গভীর হতে পারে, তা এই কয়েকটি পংক্তিতেই প্রকাশ পেয়েছে। বছরের শেষ দিনেও কবি নিজেকে অগোছালো ও অপ্রস্তুত মনে করেন—
“বছরের শেষ দিনেও ভীষণ আগোছালো আছি।
কিছুতেই প্রস্তুত নই।”
এই অপ্রস্তুতি শুধু সময়ের জন্য নয়, জীবনের জন্যও। কবিতার শেষাংশে এসে এক অব্যক্ত প্রেম, অনুশোচনা এবং নিঃসঙ্গতার গভীর বেদনা ফুটে ওঠে—
“অথচ আমি ভুলগুলি নিয়ে দিব্যি বেঁচে আছি
কি করে ভুলে যাই লজ্জায় অবনত দু’চোখ?
তোমার দু হাতের স্পর্শরেখা?”
এবং এক চূড়ান্ত নিঃসঙ্গ উপলব্ধি—
“জানি আর কেউ কোনদিন বলবে না
তোমাকে ছুঁয়ে স্বর্গ পেলাম।
প্রপাতের ছন্দে মুঠো মুঠো প্রেম।”
ভাস্কর সাহার ‘এইদিন সেইদিন’ কবিতাটি সহজ ভাষায় লেখা হলেও এর অনুভব গভীর ও বহুমাত্রিক। এখানে স্মৃতি যেমন আছে, তেমনি আছে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের বেদনা, একাকীত্বের নির্মোহ স্বীকারোক্তি এবং জীবনের প্রতি এক ধরনের অনিশ্চয়তা।
সব মিলিয়ে, এটি শুধু একটি কবিতা নয়—বরং এক মানুষের অন্তর্জগতের নিঃশব্দ আর্তি, যেখানে আনন্দের স্মৃতিগুলোও শেষ পর্যন্ত দহন হয়ে ফিরে আসে। এমন একজন মানবিক চিকিৎসক ও সংবেদনশীল কবির ক্ষেত্রে প্রত্যাশা একটাই—তিনি যেন সব কুৎসা ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে থেকে বরিশালের মাটিতেই তার সৃজন ও মানবিকতার আলো ছড়িয়ে যেতে পারেন।