সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০৮:৪৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ছাত্র বা সন্তানের বয়সি কর্মকর্তারাও ‘স্যার’ সম্বোধন শুনতে চান নরসিংদী জেলা পুলিশের মাসিক কল্যাণ সভা ও অপরাধ পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত পঙ্গু হাসপাতালে বেগম খালেদা জিয়ার নামে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মোড়ক উন্মোচন ও পিঠা উৎসব অনুষ্ঠিত প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাৎ শেষে নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করল এনসিপি বৈষম্য ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশের পথে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিন: প্রধান উপদেষ্টা নরসিংদীর বেলাবোতে দুই ব্যবসায়ীর ঝগড়ায় একজনের মৃত্যু, ভাঙচুর-আগুন জুয়ার আসরে অভিযান, ১২ জুয়ারিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ বাবা–মায়ের সঙ্গে অভিমানে সিংড়ায় যুবকের মর্মান্তিক আত্মহত্যা কুড়িগ্রামে এলপিজি গ্যাসের দাম দ্বিগুণ: তবু মিলছে না গ্যাস রাণীশংকৈলে জাল দলিল চক্রের এক সদস্য আটক

অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় ডুবছে মেঘনা ইন্স্যুরেন্স

তুহিন ভূঁইয়া:
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২৫

আইন লঙ্ঘন, বছরের পর বছর অনিয়ম দুর্নীতি, অবৈধ কর্মকাণ্ড, অতিরিক্ত কমিশন, ভ্যাট ফাঁকি, ট্যারিফ রেট লঙ্ঘন, ভুয়া নিয়োগ, পুনঃবীমায় জালিয়াতি প্রশাসনিক অদক্ষতা, অডিটবিহীন ক্লেইম পরিশোধ, কারচুপি ও অর্থ আত্মসাতে ডুবতে বসেছে মেঘনা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি। কোম্পানির শীর্ষ ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের ব্রাঞ্চ পর্যন্ত বিস্তৃত অসংখ্য অভিযোগ- এখন বীমা খাতজুড়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের সংকট নিয়ে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক নিউজের আজ থাকছে প্রথম পর্ব…

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, বীমা আইন এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) প্রবিধান অমান্য করে ব্যাবসা করছে সাধারণ বীমা প্রতিষ্ঠান মেঘনা ইন্স্যুরেন্স। ভুয়া ডেভেলপমেন্ট অফিসার দেখিয়ে বেতন আত্মসাৎ, ট্যারিটি প্রিমিয়াম গোপন, অডিটবিহীন ক্লেইম পরিশোধ, ভারপ্রাপ্ত সিইও হিসেবে এম এ জাহের চৌধুরীর অবৈধ দায়িত্ব পালন এবং তাঁর স্ত্রীর ডামি অ্যাকাউন্টে কমিশন তোলার অভিযোগসহ বহু অপরাধ কোম্পানির অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অনিয়ম ও আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে তারল্য সংকটে ভুগতে থাকা এই কোম্পানি গ্রাহকদের দাবী পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে। এমনকি বিনিয়োগ সংক্রান্ত জটিলতার পাশাপাশি রিজার্ভ ঘাটতির বিষয়টিও প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য সমস্যার কারণে আইডিআরএ একাধিকবার জরিমানা করলেও সংশোধন হয়নি। তাদের সমস্যা দিন দিন বাড়ছেই।

মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের বিভিন্ন সময়ে অডিটে বেরিয়ে এসেছে বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনিয়ম। ২০১৯–২০২০ অর্থবছরে ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকার অতিরিক্ত কমিশন প্রদানের তথ্য আইডিআরএ’র তদন্তে উঠে এসেছে। তৎকালীন মুখ্য নির্বাহী আবু বকর সিদ্দিকের সময়ে এক কোটি ৫৫ লাখ টাকার স্টক রিপোর্টবিহীন ও কোনো ক্লেইম ফাইল ছাড়াই দাবি পরিশোধের ঘটনা এখনো রহস্য ঘেরা। ২০২১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সময়ে মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের ওপর আরোপিত কোটি টাকার জরিমানার হিসাব নিজেই বীমা খাতের অস্থিরতার সাক্ষী। ২০১১–২০১৮ সালের মধ্যে ১৩ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি ও ২৬ কোটি টাকার প্রিমিয়াম গোপনের অভিযোগ, এবং ২০২২ সালে ভ্যাট জমা না দেওয়ার স্বীকারোক্তি—সব মিলিয়ে আর্থিক অনিয়মের পাহাড় তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এছাড়া কোম্পানির প্রকৃত প্রিমিয়াম পরিবর্তন করে নামমাত্র প্রিমিয়াম দেখানো, ট্যারিটি প্রিমিয়ামের ৩৪ কোটি টাকা বকেয়া রেখে তা গোপন করা, এবং সাম্প্রতিক ট্যারিটি কভার নোটের বিপরীতে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধের মতো ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে কোম্পানির আর্থিক স্বচ্ছতা চরম প্রশ্নের মুখে।

শত অনিয়মে জর্জরিত প্রতিষ্ঠানটি তারল্য সংকটের কারণে সরকারি সিকিউরিটিজে নির্ধারিত হারে বিনিয়োগ করতেও ব্যর্থ হয়- প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি সিকিউরিটিজে সেখানে মেঘনার কমপক্ষে আরও ৪ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় প্রায় সকল নিয়ম ভঙ্গ করছে মেঘনা কর্তৃপক্ষ। বর্তমান সিইও এম এ জাহের চৌধুরী আইডিআরএর চূড়ান্ত অনুমোদনের আগেই প্রায় এক বছর ভারপ্রাপ্ত সিইও দায়িত্ব পালন করেন— যা আইনগতভাবে স্পষ্ট নিষিদ্ধ। একই সময়ে তিনি “অধ্যাপক” পরিচয় ব্যবহার করলেও কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনার প্রমাণ দিতে পারেন নি। যার জন্য আইডিআরএতে ক্ষমা চেয়ে “অধ্যাপক” পদবী বাদ দিয়েছিলেন। তার এই জালিয়াতি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম নেয়। শুধু তাই নয়, তার নিয়ন্ত্রণাধীন চট্টগ্রাম জুবলি ব্রাঞ্চে নিয়েও বেরিয়ে আসে ভয়াবহ তথ্য— যেখানে নিজের স্ত্রীকে এজেন্ট বানিয়ে কমিশন উত্তোলন, বহিরাগতদের ডেভেলপমেন্ট অফিসার দেখিয়ে ভুয়া বেতন উত্তোলন এবং প্রায় চার কোটি টাকার অস্বচ্ছ বাকী ব্যাবসা করার অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, সিইও বরাদ্দ গাড়ির পাশাপাশি সাবেক সিইও এবং আইডিআরএ নন-লাইফ সদস্য আবু বকরের বিরুদ্ধেও কারপুল গাড়ি ব্যবহার করার মতো অনিয়মওসহ বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম, দুর্নীতি আর লুটপাট চলছে প্রতিষ্ঠান জুড়ে। এখানে আইনের শাসন না থাকায় সবাই সুযোগ গ্রহণ করছে। মেঘনা ইন্স্যুরেন্স যা করছে তা বীমা খাত সম্পর্কে জনগণের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ করতে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানটির জন্য অন্ধকার ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।”

এ বিষয় কোম্পানি সেক্রেটারি সাইফুল কবির ফোনে কিছু ব্যাখ্যা দিলেও অভিযোগগুলোর কোনোটিরই সঠিক জবাব দেননি—বরং ‘‘নিউজ করে দিন’’ এমন মন্তব্য করে সার্বিক বিষয় এড়িয়ে ‍যান।

এ বিষয় সিইও এম এ জাহের চৌধুরী কাছে লিখিত প্রশ্ন দেয়া হলেও তিনি নির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানান নি। ‘প্রশ্ন দেখে উত্তর জানাবো’ বলে ফোন কেটে দেন। এরপর ফোন করা হলেও রিসিভ করেন নি।

এমনকি অভিযোগগুলো নিয়ে মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান মুসফিক রহমানের কাছে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয়। বক্তব্য জানতে তাকে ফোন করা হলে তিনি প্রশ্নগুলো দেখার পর থেকে আর ফোন রিসিভ করেননি।

এ প্রসঙ্গে, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)- এর এক কর্মকর্তা বলেন, বীমা খাতে কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দীর্ঘ বছর ধরে জমে থাকা মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের এসব অনিয়ম, দুর্নীতি ও আর্থিক অস্বচ্ছতা নিয়ে- অনুসন্ধানের প্রথম পর্বের মাধ্যমে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল এক ভয়াবহ বাস্তবতার সূচনা মাত্র। ৫ পর্বের ধারাবাহিক সংবাদের দ্বিতীয় পর্বে আসছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য—অপেক্ষায় থাকুন।

– প্রিয় পাঠক, আপনার কাছেও যদি প্রতিষ্ঠানটির কোনো তথ্য থাকে, আমাদের সঙ্গে শেয়ার করুন।

ভালো লাগলে নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2011-2025 VisionBangla24.Com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com