বিষয়টি ফেসবুকে এত বেশি ভেসে বেড়াচ্ছে যে কিছু কথা না বলে আর পারছি না। প্রশাসনে কর্মরত নিজের ছাত্র বা সন্তানের বয়সি কর্মকর্তারাও ‘স্যার’ সম্বোধন শুনতে চান। এমনকি নারী কর্মকর্তাদেরও ‘স্যার’ ডাকতে হয়—এমন ঘটনাও কম নয়। করোনাকালীন সময়ে একজন নারী ইউএনওকে ‘স্যার’ না ডাকার অপরাধে এক ব্যবসায়ী প্রহৃত হয়েছিলেন। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক একজন নারী জেলা প্রশাসককে ‘স্যার’ না ডেকে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন, সেটিও তখন ভাইরাল হয়েছিল। এ নিয়ে দেশের নাগরিক সমাজে উৎকণ্ঠা নতুন নয়।
এই ব্রিটিশ আমলের ‘স্যার’ শব্দটিকে যদি আপনি বাংলা অভিধান দেখে বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান দেখিয়ে কাউকে ‘মহাশয়’ বলে সম্বোধন করেন, তাহলে আপনার বিষয়-আশয় চৌদ্দগুষ্টির কেল্লাফতে হয়ে যেতে পারে। সুতরাং ‘স্যার’ যেন একটি অপরিবর্তনীয় শব্দ। এর কোনো ভাষান্তর, প্রতিশব্দ বা সমার্থক শব্দ নেই।
একবার এক অধ্যক্ষ স্যার একজন সরকারি অফিসের পিয়নকে বারবার ‘স্যার’ ডাকতে ডাকতে প্রায় মুখে ফেনা তুলে ফেলেছিলেন। পিয়নটি একবারও মুখ ফিরিয়ে বলেনি—‘ছিঃ, আপনি আমাকে স্যার ডাকছেন কেন স্যার? স্যার তো আপনি, এভাবে আমাকে লজ্জা দেবেন না।’ বরং দেখলাম, ওই পিয়নটিও বেশ রাগে ধমক দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ যাকে ‘স্যার’ ডাকার কথা, তার উল্টো চিত্র।
আমি কিছুটা মেজাজ গরম করে অধ্যক্ষ স্যারকে বললাম, ‘আপনি কী শুরু করেছেন? একজন পিয়নকে বারবার স্যার ডাকছেন!’ তিনি তাৎক্ষণিক জবাব দিলেন, ‘আমার কাজ নিয়ে বিষয়। নতুন প্রিন্সিপাল হয়েছেন, কিছুদিন পর বুঝতে পারবেন।’ তখন বুঝলাম, ‘স্যার’ হচ্ছে পৃথিবীর অমূল্য সম্পদ—এটাকে সুযোগ থাকলে হাতছাড়া করা উচিত নয়।
যাই হোক, সহজ কথায় আসি। প্রশাসনের সবাইকে ঢালাওভাবে একই কাতারে বিবেচনা করা ঠিক নয়। প্রশাসনের অনেক উচ্চপদস্থ অফিসার আছেন, যারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে কখনোই অসৌজন্য আচরণ করেন না। এ রকম অসংখ্য উদাহরণ আমার কাছে আছে।
এবার আসি নারী ইউএনও শামিমার বিষয়ে, যেটা নিয়ে এখন ফেসবুক সয়লাব। আমি সেই কথোপকথনের অডিও শুনেছি। একজন ইউএনও নারী হোন বা পুরুষ হোন, বয়সে বা শিক্ষায় আপনার ছোট হোন কিংবা বড় হোন—তিনি ঐ উপজেলার প্রধান কর্তা বা নির্বাহী কর্মকর্তা। তাকে আপনি ‘স্যার’ না ডাকলেও ‘ম্যাডাম’ তো বলতে পারেন। একজন শিক্ষিত অফিসারকে ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করলে কারও সম্মানহানি হয় না।
কিন্তু যাকে আপনি ‘আপু’ বলে সম্বোধন করলেন, তিনি আপনার বান্ধবীর ছোট বোন নন—তিনি আপনার উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার ইউএনও শামিমা আক্তার জাহানের কথাবার্তায় আমি তেমন কোনো ত্রুটি দেখতে পাইনি। আপনারা কি দেখেছেন জানি না।
লেখক: কবি ও বিশ্লেষক মাসুদ আলম বাবুল
অধ্যক্ষ, হাজী আক্কেল আলী হাওলাদার কলেজ, পটুয়াখালী।