অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের চাপে সাধারণ ধারণা ছিল—সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোক্তারা। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বড় অংকের ঋণই এখন খেলাপির ভারে নুয়ে পড়েছে, আর সবচেয়ে শৃঙ্খলিত অবস্থানে রয়েছে ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ৫০ কোটি টাকার বেশি অংকের ঋণের প্রায় অর্ধেক—৪৮ দশমিক ২ শতাংশ—ই এখন খেলাপি। বিপরীতে ১ কোটি টাকার নিচে বিতরণ করা ঋণের খেলাপি হার মাত্র ১৬ শতাংশ, যা সামগ্রিক গড়ের অর্ধেকেরও কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ খেলাপি ছিল। তবে ঋণের অংকভেদে বিশ্লেষণ করলে চিত্র আরও স্পষ্ট হয়।
১ থেকে ১০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার ২৬ দশমিক ১ শতাংশ হলেও ১০ থেকে ২০ কোটি টাকায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশে। ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকায় সামান্য কমে ৩৮ শতাংশ হলেও ৩০ থেকে ৫০ কোটি টাকার মধ্যে আবারও খেলাপির হার ৪২ থেকে ৪৬ শতাংশে উঠে যায়। সবশেষে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণেই দেখা যায় সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা।
ব্যাংক নির্বাহী ও বিশ্লেষকদের মতে, এই চিত্র মূলত বড় উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ ফেরত না দেয়ার দীর্ঘদিনের সংস্কৃতিরই প্রতিফলন। রাজনৈতিক প্রভাব, পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার যোগসাজশে বছরের পর বছর ঋণের নামে অর্থ লোপাট হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সময়ে অনেক ব্যাংক কার্যত লুটপাটের যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
অন্যদিকে, চরম অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোক্তারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করে যাচ্ছেন। বেসরকারি খাতে সিএমএসএমই ঋণে সবচেয়ে বড় ব্যাংক ব্র্যাক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার আড়াই শতাংশেরও নিচে। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঋণ শোধে সবচেয়ে বেশি আন্তরিক।
তার ভাষায়, সঠিক গ্রাহক বাছাই ও মাঠপর্যায়ে নিবিড় তদারকি থাকলে ছোট ঋণ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি কমে আসে। যদিও দেশজুড়ে নেটওয়ার্ক ও বিপুল জনবল ধরে রাখার কারণে এ খাতে পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক বেশি, তবু এটিই টেকসই ব্যাংকিংয়ের ভিত্তি বলে মনে করেন তিনি।
ক্ষুদ্র ঋণের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সিটি ব্যাংকের ডিজিটাল ন্যানো লোন। বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে জামানত ও কাগজপত্র ছাড়াই ৫০০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করছে ব্যাংকটি। এ পর্যন্ত ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ হয়েছে, যেখানে খেলাপির হার মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ।
সিটি ব্যাংকের এমডি ও সিইও মাসরুর আরেফিন বলেন, করপোরেট সুশাসন ও গ্রাহক যাচাইয়ের ওপর জোর দেয়ায় ব্যাংকটি খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে। বড় করপোরেটের পরিবর্তে সিএমএসএমই ও রিটেইল খাতে মনোযোগ দেয়াই এ সাফল্যের মূল কারণ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো—বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার এখন বিশ্বে সর্বোচ্চ। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন, লেবানন কিংবা অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তান ও শ্রীলংকার তুলনায়ও বাংলাদেশের অবস্থা খারাপ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, অতীতে অনেক খেলাপি ঋণ কৃত্রিমভাবে আড়াল করে রাখা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সেগুলো প্রকাশ্যে এসেছে বলেই হার হঠাৎ বেড়ে গেছে। তার মতে, প্রকৃত উদ্যোক্তারা—বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও ছোট ব্যবসায়ীরা—সবসময়ই ব্যাংক ঋণ ফেরত দেন।
তথ্য বলছে, খেলাপি ঋণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অবদান সামান্য হলেও ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদেরই বেশি। এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরীর অভিযোগ, জামানত ও নিয়মের কঠোরতা ছোট উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে, যদিও তাদের ঋণ পরিশোধের হার ৯৮–৯৯ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতকে টেকসই করতে হলে বড় ঋণে শাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণপ্রবাহ আরও সহজ করতে হবে। নইলে খেলাপির ভারে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা আরও গভীর সংকটে পড়তে পারে।