সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৩:৩২ অপরাহ্ন

নতুন সরকারের সামনে কঠিন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যেই ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। নবনির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিচ্ছে এমন সময়ে যখন আর্থিক ও বাহ্যিক খাতের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, স্বল্পমেয়াদী ভারসাম্যহীনতা যেন দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত দুর্বলতায় রূপ না নেয়, সে জন্য দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।

বিশ্লেষকরা সাতটি খাতকে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন: সরকারি অর্থায়ন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, জ্বালানি খাতের সুশাসন এবং বাহ্যিক খাতের স্থিতিশীলতা। এগুলো একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত; কোনো একটির দুর্বলতা অন্য খাতের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়াতে পারে। এজন্য বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপের বদলে সুসংহত পরিকল্পনার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

সরকারের আর্থিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত। ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের তুলনায় রাজস্ব আহরণ এখনও অনেক পিছিয়ে। ভর্তুকি প্রদান, ঋণ পরিশোধ ও সামাজিক সুরক্ষা খাতের প্রতিশ্রুতি মেটাতে বাজেট ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা সুদের হার ও বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবাহকে প্রভাবিত করছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “ঋণ গ্রহণ কখনোই কাঠামোগত কর সংস্কারের বিকল্প হতে পারে না। রাজস্ব আহরণে উন্নতি এবং ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ অপরিহার্য।” তিনি করের আওতা বাড়ানো, আইন প্রয়োগ জোরদার করা এবং ভর্তুকি যৌক্তিক পর্যায়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

সাধারণ মানুষের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ মূল্যস্ফীতি। খাদ্য ও জ্বালানির উচ্চমূল্য নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম কমলেও দেশে খুচরা বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।

সিপিডি লক্ষ্য করেছে, দেশের সরবরাহ শৃঙ্খলের অদক্ষতা এবং বাজার তদারকির অভাব এ সমস্যার মূল কারণ। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় চাল ও গমের উৎপাদন লক্ষ্য ৪৪২ দশমিক ২ লাখ টনের তুলনায় কম (৪১৬ দশমিক ৬ লাখ মেট্রিক টন)। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলছেন, “মূল্য স্থিতিশীল করতে শুধু সুদের হার সমন্বয় যথেষ্ট নয়। বাজার তদারকি ও খাদ্য বিতরণে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।”

খেলাপি ঋণের হার ৩৬ শতাংশে অবস্থান করছে এবং সুশাসনের অভাব রয়েছে। ব্যাংকিং খাতের এই সংকট বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ড এবং দীর্ঘমেয়াদী মূলধন গঠনে অন্তরায়।

সানেমের ড. সেলিম রায়হান বলেন, “বিনিয়োগের গতি ফেরাতে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার জরুরি।” ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম (সিপিডি) যোগ করেন, স্বচ্ছ সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার জবাবদিহি এবং স্থিতিশীল নীতিমালা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সহায়ক।

বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে সীমিত করছে, সরবরাহে বিঘ্ন উৎপাদন ও রপ্তানি প্রতিযোগিতার ওপর প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হলেও অর্থনৈতিকভাবে অপরিহার্য।

বাহ্যিক খাতেও ঝুঁকি রয়েছে। বিনিময় হার, রিজার্ভ পর্যাপ্ততা এবং রপ্তানির নির্ভরতা দেশের বৈদেশিক লেনদেনকে প্রভাবিত করছে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বজায় রাখা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো নীতির সঠিক সমন্বয়। আর্থিক সংকোচন, মুদ্রানীতি ও কাঠামোগত সংস্কার একটি সমন্বিত কাঠামোর অধীনে পরিচালনা করতে হবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাংলাদেশ এখন নাজুক অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। দ্রুত ও সাহসী সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে দেশ স্থিতিশীলতায় ফিরবে নাকি দীর্ঘমেয়াদী সংকটে নিমজ্জিত হবে।

ভালো লাগলে নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2011-2025 VisionBangla24.Com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com