রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬, ০৯:৪৪ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক:সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে প্রায় ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগের তদন্ত করতে এসে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিজেই বিতর্কের মুখে পড়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, তদন্তে এসে তিনি সরেজমিনে যাচাই-বাছাই না করে স্থানীয় একটি ভিআইপি মোটেলে বসে খাবার গ্রহণ ও উপহার নিয়ে ফিরে গেছেন।
রোববার (২৯ মার্চ) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পরিচালক (প্রশাসন) মো. আব্দুল রশীদ লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে শাহজাদপুরে আসেন। তবে তদন্তের পরিবর্তে তিনি বিসিক বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত একটি মোটেলে অবস্থান করে পিআইওর সঙ্গে বৈঠক করেন বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগকারীর দাবি, তাকে ডাকা তো দূরের কথা, উল্টো আবার নতুন করে লিখিত দিতে বলা হয় এবং ঘটনাস্থল থেকে বের করে দেওয়া হয়।
লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ২০২০-২১ অর্থবছরে নদীভাঙন কবলিতদের জন্য বরাদ্দ ৪৬ লাখ টাকা, আশ্রয়ন প্রকল্পের মাটি ভরাটের গম এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের কাবিটা, টিআর ও কাবিখা প্রকল্পের বরাদ্দ মিলিয়ে প্রায় ৩ কোটি টাকা কাজ না করেই আত্মসাৎ করা হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. মোতাহার হোসেন এ বিষয়ে ২০২৫ সালের আগস্টে মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর অভিযোগ করেন।
তদন্তে এসে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আপ্যায়ন গ্রহণ ও উপহার নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে পিআইও অফিসের এক স্টাফ এ বিষয়ে মন্তব্য এড়িয়ে যান। অন্যদিকে সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গেলে তদন্ত কর্মকর্তা কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন।
এ ঘটনা শুধু একটি উপজেলার বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়—সারাদেশেই পিআইওদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্যমতে, দেশের ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে অন্তত ২০৫ জন পিআইওর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ রয়েছে, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৪১ শতাংশ। তাদের মধ্যে ৪৭ জনের বিরুদ্ধে মাদক সেবনের অভিযোগও রয়েছে, যা প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
অভিযোগ রয়েছে, টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে কাজ না করেই অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে বিল উত্তোলন, ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন আদায়—এসব অনিয়ম অনেক ক্ষেত্রে নিয়মে পরিণত হয়েছে। এমনকি মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া অভিযোগও অনেক সময় রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি উন্নয়ন কার্যক্রমের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, পিআইওদের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়, তবে মাদকাসক্তির অভিযোগ অত্যন্ত ভয়াবহ এবং দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস থাকলেও বাস্তবে দুর্নীতির লাগাম টানা যাচ্ছে না। বিভিন্ন জেলায় আত্মসাৎ, ভুয়া প্রকল্প ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে একাধিক পিআইওর বিরুদ্ধে মামলা ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি।
শাহজাদপুরের সাম্প্রতিক ঘটনাটি তাই আবারও প্রশ্ন তুলেছে—দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে গিয়ে যদি স্বচ্ছতা না থাকে, তবে দায়ীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে কীভাবে?