বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০১:২৯ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
বাগমারায় গোবিন্দপাড়া ইউপি চেয়ারম্যানের ঈদ উপহার বিতরণ নতুন উচ্চতায় প্রবেশ করছে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক : ড. ইউনূস গৌরীপুর রিপোর্টার্স ক্লাবের উদ্যোগে দোয়া ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত উদ্দিপ্ত তরুন সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে ঈদ উপহার সামগ্রী বিতরণ রূপগঞ্জের কাঞ্চনে ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে মিথ্যা অপপ্রচারের শিকার হলেন কফিল উদ্দিন সওজ অধিদপ্তরে মদ জুয়ার কাসিনো চালায় প্রকৌশলী জাহিদ উজ্জল স্মৃতিসৌধে ‘জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান, আটক ৩ সাইবার নিরাপত্তায় MGST এজেন্সির ফাহিমের প্রশংসনীয় উদ্যোগ শিশু ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে কুড়িগ্রামে আটক-১ মানিব্যাগও ছিল না, এখন বিশাল শোডাউন কীভাবে- সারজিসকে তাসনিম জারার প্রশ্ন
বৈদ্যূতিক লাইনম্যান থেকে হয়ে উঠা পান কবিরাজ শাহ জালালের ভূয়া কবিরাজি চিকিৎসার ফাঁদে হাজারো মানুষ!

বৈদ্যূতিক লাইনম্যান থেকে হয়ে উঠা পান কবিরাজ শাহ জালালের ভূয়া কবিরাজি চিকিৎসার ফাঁদে হাজারো মানুষ!

বৃন্দাবন মল্লিকের প্রতিবেদন:

প্রবাদ আছে ঝড় মরে ফকিরের কেরামতি বাড়ে। ফকির এখানে সুযোগ সন্ধানী ও মিথ্যাবাদী। নিজের পক্ষ কোন ঘটনাকে নেয়ার অপকৌশল করে থাকে ফকির। ফকির এখানে ফিকির বা ধান্দা করে যে। তন্ত্রমন্ত্র, ঝাড় ফুক, পানিপড়া, চালপড়া ইত্যাদির মাধ্যমে ফকিররা চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা করে থাকে। এসব ফকিরদের অনেকে আবার কবিরাজও বলে থাকেন। যদিও কবিরাজ বা হেকিম হচ্ছে গাছগাছালি, লতাপাতা, ইত্যাদি দিয়ে ভেষজ ওষুধ থেরি করে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। কিন্তু গ্রাম বাংলায় এক ধরনের প্রতারকরা কাবিরাজ নাম ব্যবহার করে মানুষের অন্ধবিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে অপচিকৎিসার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। দুঃখজনক ব্যাপার হলো- এই আধুনিক যুগে বিশিষত গ্রামের মানুষ কবিরাজি বা ফকিরালী চিকিৎসা খুঁজে বেড়ায়। এসব কবিরাজরা আসলে ভণ্ড বা প্রতারক।

এমন একজন ভণ্ড কবিরাজ আছেন মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার রশুনিয়া গ্রামে। তার নাম শাহ জালাল। তাকে এখন পান কবিরাজ বা পান ফকির বলে সবাই চেনে। কয়েক বছর আগেও ছিলেন তিনি পল্লি বিদ্যুৎ অফিসের অস্থায়ী লাইনম্যান। যারা কাজ ছিল মানুষের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে মিটার লাগানো। আর সেই ব্যক্তিই কিনা এখন মানুষের মন আর সংসার জোড়া লাগানোর কারিগর! রশুনিয়া গ্রামের শাহ জালাল কয়েক বছর আগেও এলাকায় কারেন্টের মিস্ত্রি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এখন তিনি পান কবিরাজ নামে পরিচিতি লাভ করেছেন। তিনি প্রচুর পান খান বলে তাকে পান কবিরাজ বলে লোকে। পল্লি বিদ্যুতের লাইন ম্যান থেকে পান কবিরাজ হয়ে ওঠা শাহ জালাল দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণার মাধ্যমে মানুষকে বোকা বানিয়ে ভুয়া কবিরাজি চিকিৎসা দিয়ে আসছে। তারপরও মানুষ তার কৌশল ও আচরণে ‘চুনকে দই’ ভেবে প্রতারিত হয়ে আসছে বহু আগে থেকেই। তার খপ্পরে পড়ে প্রতারিত হয়েছেন জেলার অন্তত কয়েক হাজার মানুষ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় তেমন শিক্ষিতও নন তিনি। নেই কবিরাজি বা হেকেমি শিক্ষা। তারপরও নাকি তিনি কবিরাজ! স্থানীয়দের ভাষ্য, পান কবিরাজ শাহ জালাল ২০১০ সাল স্বপ্নে সৃষ্টিকর্তার অলৌকিক আশীর্বাদ পেয়েছেন বলে তার কিছু দালালদের দিয়ে এলাকায় প্রচারণা চালায়। আস্তানা গড়ে তোলার পর সেখানে চিকিৎসার নামে চলে প্রতারণা। শাহ জালাল পান কবিরাজ দীর্ঘদিন যাবৎ সংসারে অশান্তি, স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্ব, বন্ধ্যাত্ব, পছন্দের মানুষকে পাইয়ে দেওয়া, অবাধ্য সন্তানকে বশীকরণসহ নানাবিধ সমস্যার মৌখিক সমাধান দিয়ে আসছিলেন। তিনি জ্বিন দ্বারা কবিরাজি চিকিৎসা করেন মর্মে প্রতারণার অভিনব কৌশল হিসেবে প্রতি রাতে তার নিজ বাড়িতে আসন বসান। এ কাজে তার কাছে থাকা জ্বিন তাকে সহযোগিতা করে বলে তিনি রোগীদেরকে বোঝান। এসব ক্ষেত্রে তিনি প্রতারণার অংশ হিসেবে প্রতি দিন তার নিজ বাড়িতে আসন বসান। নানা সমস্যা নিয়ে আগত রোগীদের ওই জ্বিনের আসর থেকে চিকিৎসা স্বরূপ কারো বাড়িতে শত্রুতাবশত তাবিজ, কারো বাড়িতে পুতুল পুঁতে রাখা আছে এবং এসব কারণেই তারা ভুগছেন মর্মে রোগীদের বাগে আনতেন। জ্বিনের সাহায্যে রোগীদের বাড়িতে পুঁতে রাখা তাবিজ বা পুতুল তুলে এনে সমস্যার সমাধান করে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন শাহ জালাল। জ্বিনের আছড় ছাড়ানোর চিকিৎসায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকাসহ এর সমপরিমাণ মালামাল নেন তিনি।

এছাড়া বাড়ি বন্ধকরণ, জ্বিনের মাধ্যমে তাবিজ-কবজ তুলে আনার জন্য মোটা অঙ্কের টাকা নেন তিনি। সাথে এক নজর তাকিয়ে দেখার জন্য জনপ্রতি ১২০ টাকা করে নজরানা ফি নেন এই পান কবিরাজ। প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগী ফতুল্লা থানার গৃহবধূ রোসনা বেগম অভিযোগ করেন, আমার কিছু সমস্যা জনিত রোগের কারণে পান ফকিরের কাছে যাই। প্রথমে একশ এক টাকা ফি নেন। পরবর্তীতে তেল পড়া, পানি পড়া দিয়ে এক হাজার একশ টাকা হাতিয়ে নেন। এতে কোনো সুফল না পেয়ে পুনরায় তার কাছে গেলে ছাগল গোসল দেয়ার নামে আমার কাছ থেকে আট হাজার ছয়শ টাকা হাতিয়ে নেন। কাজ না হওয়াতে আমি একথা তাকে জানাতে এসেছিলাম। স্থানীয় রফিকুল, মোঃ রহমত উল্লাহ, পাপড়ি দেবনাথসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, পান ফকির স্বপ্নে আধ্যাত্মিক শক্তির বলীয়ান হয়েছেন এবং যেকোনো মানুষের অতীত ও ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারেন মর্মে কথিত পান ফকিরের দালালরা এই বলে প্রচারণা চালান। এতে অসহায় অজ্ঞ লোকজন দূরদূরান্ত থেকে এই ভন্ড ফকির বা কবিরাজের কাছে আসেন। তার জিন দ্বারা তাবিজ-কবজ তুলে আনার বিষয়টিম প্রতারণার কৌশল মাত্র। প্রকৃত পক্ষে তিনি কোন জ্বিন বস করতে পারেননি, তিনি জীবনে কখনো জ্বিন দেখেছেন কিনা তা নিয়েও স্থানীয়দের সন্দেহ রয়েছে। এ বিষয়ে রশুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবু সাঈদ বলেন, আসলে ও একটা ভণ্ড প্রতারক। এক সময় পল্লি বিদ্যুরে লাইনম্যান হিসেবে কাজ করে বাড়ি বাড়ি। পরে শুনি ও নাকি কবিরাজ হয়ে গেছে। স্বপ্নে ও অলৌকিক শক্তি পেয়েছে, যা দিয়ে মানুষের সব রোগের চিকিৎসা করে। ওর কিছু দালাল আছে যারা ওর পক্ষ নানা অলৌকিক কথা প্রচার করে এবং ওকে এক আধ্যাত্মিক মানুষ হিসেবে তুলে ধরে। ওর প্রতারানা শিকার হয়েছে ও হচ্ছে অনেক নিরীহ মানুষ দূরদূরান্ত থেকে এসে। তবে স্থানীয়দের কাছে এখন ওর তেমন গুরুত্ব নাই। দূরদূরান্ত থেকে বিভিন্ন রোগীরা আসে। প্রতারণার কারণে ওর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, জেল খেটেছে। আবার স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে ওর অপচিকিৎসা চালাচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রশাসনের জোড়ালো ভূমিকা রাখতে হবে। ভণ্ড কবিরাজের বা ফকিররা নানা তদবির, সাধক-কবিরাজদের তেল-পড়া, আটাপড়া, বাটি চালান, ঘটি চালান আর যাদু-টোনা—এসবে মানসিক রোগ ভালো হয় না বরং ক্ষেত্র বিশেষে রোগ চরম আকার ধারণ করে, ঘটে দুর্ঘটনা। পরিবারের জন্য করুণ পরিণতি বয়ে আনে। এসব ভণ্ড কবিরাজরা নানা কৌশলে লোক জড়ো করে সব ধরনের রোগ নিরাময়ের শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে এলাকার সহজ-সরল মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা নিচ্ছেন। এদের চিকিৎসার অন্যতম উপাদান হল উদ্ভট সব পন্থায় মানুষকে ‘বিশ্বাস’ করানো যে, ‘প্রকৃত’ চিকিৎসা চলছে।

শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নির্যাতন, ঝাড়ফুঁক, তাবিজ-কবজ এসব মানুষ সহজেই মেনে নেয় কারণ তারা কবিরাজি যুগযুগ ধরে এভাবেই করতে দেখেছে। এক শ্রেণীর লোক আছেন যারা বলে বেড়ায়, অনেক চিকিৎসা আছে যা ডাক্তাররা সারাতে পারেন না। কবিরাজ পারেন। এই সুযোগে কবিরাজ কিছু অর্থ হাতিয়ে নেয়। অনেক অ্যাকাডেমিক শিক্ষিত লোক আছেন তারা কুসংস্কারে বিশ্বাসী। ‘শিক্ষার-অভাব একারনে কবিরাজি চিকিৎসা নেয়, একথাটিও অর্ধসত্য। তবে শুধু ‘বিশ্বাস ও ‘স্তুতির উপর এদের অপচিকিৎসার ব্যবসা নির্ভরশীল। আসলে দরকার সুশিক্ষা, আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার ব্যাপক প্রসার। অন্ধ বিশ্বাস ও অপচিকিৎসা থেকে মুক্তি পেতে হবে । সরকারের উচিত মানুষকে সচেতন করা, আধুনিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রধান ভূমিকা পালন করা।

ভালো লাগলে নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2011 VisionBangla24.Com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com