ঢাকা    শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
ভিশন বাংলা ২৪

গজারিয়ায় প্রশাসনের গাফিলতিতে ফসলি জমি বিপন্ন



গজারিয়ায় প্রশাসনের গাফিলতিতে ফসলি জমি বিপন্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক:

মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়া উপজেলার বাউশিয়া ইউনিয়নের চরবাউশিয়া মৌজায় শিল্পকারখানা স্থাপনের নামে তিন ফসলি কৃষিজমি ও সরকারি খাস সম্পত্তি অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু ভরাটের অভিযোগে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ‘সাহারা ট্রেডিং লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান জমি ক্রয় না করেই জোরপূর্বক ভরাট কার্যক্রম চালিয়েছে—যা প্রশাসনের চোখের সামনেই দীর্ঘদিন ধরে চলছিল।

মঙ্গলবার (০৩ মার্চ) সকাল ১১টার দিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে অবৈধ ড্রেজার অপসারণের নির্দেশ দেন। অনুমতি সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখাতে না পারায় এক ঘণ্টার মধ্যে ড্রেজার সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—“এতদিন প্রশাসন কোথায় ছিল?”

চরবাউশিয়া বড়কান্দি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ফসলি জমির চারপাশ উঁচু করে বালু ফেলে ঘিরে ফেলা হয়েছে। কোথাও কোথাও কংক্রিটের পিলার বসিয়ে সীমানা নির্ধারণের চেষ্টা চলছে। অভিযোগ রয়েছে, যেসব কৃষক জমি বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তাদের জমির চারপাশে বালু ফেলে পানি আটকে চাষাবাদ অযোগ্য করে তোলা হচ্ছে—যেন বাধ্য হয়ে তারা জমি বিক্রি করেন।

স্থানীয় কৃষক মজিবুর রহমান বলেন,“এই জমিই ছিল আমাদের একমাত্র সম্বল। চারদিকে বালু ফেলে আমাদের জমি ডুবিয়ে দিয়েছে। এখন জমি বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই—এটাই ওদের কৌশল।”

ফাতেমা বেগম নামের আরেক ভুক্তভোগী বলেন, “আমরা জমি বিক্রি করিনি। পাশের জমিতে বালু ফেলার কারণে আমাদের অর্ধেক জমি নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতিবাদ করতে গেলে ভয়ভীতি দেখানো হয়।”

একাধিক কৃষক জানান, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তাদের জমিতে যেতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবাদ করায় শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার অভিযোগও উঠে আসে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১ নম্বর খাস খতিয়ানের জমিও বন্দোবস্ত ছাড়াই ভরাট করা হয়েছে। এমনকি কোম্পানির সীমানা থেকে খাস সম্পত্তির ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণের কাজও চলমান রয়েছে—যা সরেজমিনে দেখা গেছে।

এ বিষয়ে নদী খাল ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক শফিক আলী বলেন, “গত এক দশকে গজারিয়ায় কয়েক হাজার হেক্টর কৃষিজমি হারিয়ে গেছে। প্রশাসন যদি সময়মতো কঠোর না হয়, খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। আমরা দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।"

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, “সরকারের অনুমতি ছাড়া জমির শ্রেণি পরিবর্তনের সুযোগ নেই। অবৈধ ড্রেজার সরিয়ে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খাস জমি দখলের অভিযোগ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি আরও জানান, ২০ একরের বেশি জমি ভরাটে ভূমি মন্ত্রণালয়ের এবং ২০ একর পর্যন্ত জেলা প্রশাসকের অনুমতি প্রয়োজন। অনুমতি ব্যতীত বালু ভরাট দণ্ডনীয় অপরাধ।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—এত বড় আকারে ড্রেজার বসিয়ে দীর্ঘদিন বালু ভরাট চললেও সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তা ও প্রশাসনের নজরে বিষয়টি আগে কেন আসেনি? অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ইউএনও ও কিছু ভূমি কর্মকর্তার যোগসাজশে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এসব কার্যক্রম চলেছে। যদিও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে সন্দেহ দানা বেঁধেছে।

বালু ভরাটের সাইটে উপস্থিত এক ব্যক্তি নিজেকে কোম্পানির কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বলেন, “সরকারের অনুমতি নিয়েই কাজ করছি। আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি।” তবে প্রশাসনের পরিদর্শনের সময় কোম্পানির কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে উপস্থিত পাওয়া যায়নি

স্থানীয়রা অবিলম্বে- অবৈধ ভরাট সম্পূর্ণ বন্ধ, খাস জমি উদ্ধার, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ, এবং জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মী গাজী মাহমুদ পারভেজ কে জানায়, জেলা প্রশাসককে অবহিত করে অবৈধ ভরাটের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

এখন দেখার বিষয়—প্রশাসনের এই তৎপরতা সাময়িক প্রদর্শনী নাকি বাস্তবেই দখল ও ভরাটের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। চরবাউশিয়ার কৃষকরা বলছেন, “কাগজে নয়, আমরা মাঠে ফল চাই।”

ভিশন বাংলা ২৪

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


গজারিয়ায় প্রশাসনের গাফিলতিতে ফসলি জমি বিপন্ন

প্রকাশের তারিখ : ০৩ মার্চ ২০২৬

featured Image

নিজস্ব প্রতিবেদক:

মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়া উপজেলার বাউশিয়া ইউনিয়নের চরবাউশিয়া মৌজায় শিল্পকারখানা স্থাপনের নামে তিন ফসলি কৃষিজমি ও সরকারি খাস সম্পত্তি অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু ভরাটের অভিযোগে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ‘সাহারা ট্রেডিং লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান জমি ক্রয় না করেই জোরপূর্বক ভরাট কার্যক্রম চালিয়েছে—যা প্রশাসনের চোখের সামনেই দীর্ঘদিন ধরে চলছিল।

মঙ্গলবার (০৩ মার্চ) সকাল ১১টার দিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে অবৈধ ড্রেজার অপসারণের নির্দেশ দেন। অনুমতি সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখাতে না পারায় এক ঘণ্টার মধ্যে ড্রেজার সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—“এতদিন প্রশাসন কোথায় ছিল?”

চরবাউশিয়া বড়কান্দি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ফসলি জমির চারপাশ উঁচু করে বালু ফেলে ঘিরে ফেলা হয়েছে। কোথাও কোথাও কংক্রিটের পিলার বসিয়ে সীমানা নির্ধারণের চেষ্টা চলছে। অভিযোগ রয়েছে, যেসব কৃষক জমি বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তাদের জমির চারপাশে বালু ফেলে পানি আটকে চাষাবাদ অযোগ্য করে তোলা হচ্ছে—যেন বাধ্য হয়ে তারা জমি বিক্রি করেন।

স্থানীয় কৃষক মজিবুর রহমান বলেন,“এই জমিই ছিল আমাদের একমাত্র সম্বল। চারদিকে বালু ফেলে আমাদের জমি ডুবিয়ে দিয়েছে। এখন জমি বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই—এটাই ওদের কৌশল।”

ফাতেমা বেগম নামের আরেক ভুক্তভোগী বলেন, “আমরা জমি বিক্রি করিনি। পাশের জমিতে বালু ফেলার কারণে আমাদের অর্ধেক জমি নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতিবাদ করতে গেলে ভয়ভীতি দেখানো হয়।”

একাধিক কৃষক জানান, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তাদের জমিতে যেতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবাদ করায় শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার অভিযোগও উঠে আসে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১ নম্বর খাস খতিয়ানের জমিও বন্দোবস্ত ছাড়াই ভরাট করা হয়েছে। এমনকি কোম্পানির সীমানা থেকে খাস সম্পত্তির ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণের কাজও চলমান রয়েছে—যা সরেজমিনে দেখা গেছে।

এ বিষয়ে নদী খাল ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক শফিক আলী বলেন, “গত এক দশকে গজারিয়ায় কয়েক হাজার হেক্টর কৃষিজমি হারিয়ে গেছে। প্রশাসন যদি সময়মতো কঠোর না হয়, খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। আমরা দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।"

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, “সরকারের অনুমতি ছাড়া জমির শ্রেণি পরিবর্তনের সুযোগ নেই। অবৈধ ড্রেজার সরিয়ে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খাস জমি দখলের অভিযোগ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি আরও জানান, ২০ একরের বেশি জমি ভরাটে ভূমি মন্ত্রণালয়ের এবং ২০ একর পর্যন্ত জেলা প্রশাসকের অনুমতি প্রয়োজন। অনুমতি ব্যতীত বালু ভরাট দণ্ডনীয় অপরাধ।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—এত বড় আকারে ড্রেজার বসিয়ে দীর্ঘদিন বালু ভরাট চললেও সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তা ও প্রশাসনের নজরে বিষয়টি আগে কেন আসেনি? অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ইউএনও ও কিছু ভূমি কর্মকর্তার যোগসাজশে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এসব কার্যক্রম চলেছে। যদিও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে সন্দেহ দানা বেঁধেছে।

বালু ভরাটের সাইটে উপস্থিত এক ব্যক্তি নিজেকে কোম্পানির কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বলেন, “সরকারের অনুমতি নিয়েই কাজ করছি। আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি।” তবে প্রশাসনের পরিদর্শনের সময় কোম্পানির কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে উপস্থিত পাওয়া যায়নি

স্থানীয়রা অবিলম্বে- অবৈধ ভরাট সম্পূর্ণ বন্ধ, খাস জমি উদ্ধার, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ, এবং জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মী গাজী মাহমুদ পারভেজ কে জানায়, জেলা প্রশাসককে অবহিত করে অবৈধ ভরাটের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

এখন দেখার বিষয়—প্রশাসনের এই তৎপরতা সাময়িক প্রদর্শনী নাকি বাস্তবেই দখল ও ভরাটের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। চরবাউশিয়ার কৃষকরা বলছেন, “কাগজে নয়, আমরা মাঠে ফল চাই।”


ভিশন বাংলা ২৪

Advisory Editor: Syed Shajahan Saju, Adviser: Advocate Shajan Majumder, Chief Editor: Tuhin Bhuiyan, Executive Editor: S.M. Kamal, Managing Editor: Bayzid Bostami, Asst. Editor: Sahara Moon, Asst. Editor: Azgar Ali
কপিরাইট © ২০২৬ ভিশন বাংলা ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত