শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬, ০২:০৯ পূর্বাহ্ন
অজ্ঞিতার ভালোবাসা মানুষের ব্যক্তিগত বোধের বিষয় এবং তা প্রত্যেক জাতির সংস্কৃতির এক বড় অংশও। প্রানিজগত, প্রকৃতি, প্রিয় মানুষ, হৃদয়ের আবেগ, অপ্রত্যস্নেহের বন্ধন সবই ভালোবাসার বহি:প্রকাশ। এ সব কিছু যেন লোপ পেয়েছে।
বদল হাওয়ায় বদল গেছে তার চার ধার। দেখা যায় না এখন আর হারিকেন, মাটির প্রদীপ, গরুর গাড়ি, সাঁকো নেই; গ্রাম গঞ্জে কালো পিচঢালা সড়ক, নদীগুলো পাড় হচ্ছে ব্রিজ দিয়ে। স্মৃতিতে গোলাভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, জালে আটকা পড়া মাছ, চৈত্রের তপ্ত রোদ এ সব কিছু যেন ঢাকা পড়ে গেছে সভ্যতার আড়ালে।
কবির জন্ম বাংলাদেশের এক পাড়াগাঁয়ে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কবির গ্রামকে সারাদেশের মানুষের কাছে পরিচিত করেছে। এক নামেই পরিচিতি পেয়েছে- রূপপুর গ্রাম। যে গ্রাম এখন আর আগের মতো পাড়া গাঁ নেই। এখন সেখানে শহরের বাতাস বয়ে যাচ্ছে। আজ কবির কিশোর বয়সের স্মৃতি মনে পড়েছে। তার বিদ্যাপীঠ তারাপদ স্কুল এখন হয়ে গেছে রূপপুর প্রাইমারি স্কুল। ধাপে ধাপে এগিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন বিজ্ঞানে পড়াশুনা করে শিক্ষকতা করেছেন ঢাকার রামপুরা একরামুন্নেছা কলেজে। এরপরেও নিজ শেকড়কে ভুলতে পারেননি। বিজ্ঞানের মানুষ হয়েও সমাজ, রাজনীতি, দেশ ও দেশের মানুষকে প্রতিটি মুহুর্তে উপলদ্ধি করেছেন। সেই উপলদ্ধি থেকেই এক একটি অক্ষর দিয়ে গেঁথেছেন মালা; যা হয়ে গেছে অর্থবহ এক একটি কবিতা। সেই কবে থেকে লেখা- সেই সব কবিতাগুলো যদি ঠিকঠিক ভাবে সংরক্ষিত থাকতো; হারিয়ে না যেতো তবে এ বইটি ৬৪ পাতার না হয়ে হয়ে যেতো শয়ের উপরে। কবির সেই দু:খটার পাশাপাশি আর একটি দু:খ স্থান পেয়েছে। পেছনের স্মৃতি কেবল তাকে কুড়ে কুড়ে দহন করছে । শৈশব কেউই ভুলতে পারেন না। কবির বুকের ভেতরেও শৈশব স্মৃতি ঢেউয়ের ফেনা তুলছে। একটু ঝড়ের দিনে আম কুড়াবার ঘটনা, তেঁতুল তলায় ভুতের গল্প, দিগন্তজোড়া মাঠের ধারে রঙের ঘুড়ি ওড়ানো, কুমাব বাড়ির মাটির তৈরি জিনিষপত্র, উলুখড়ের চৌচালা ঘর, বাঁশ বাগান, পালতোলা নৌকা, বিলের জলে গামছা ফেলে মাছ ধরা, হাডুডু-ডাংগলি খেলা, বিদ্যাসাগরের লাল মলাটের বর্ণ পরিচয়, সেদিনের আপনজন বিশ্বচরাচর থেকে লোকান্তর হয়েছেন। তাদের ছবি তাদের স্মৃতি এখন কেবল ক্যানভাসে আঁকা ছবির মতো। বুকটা হাহাকার করে। বটতলারমাঠে রথের মেলা, কলার ভেলায় বিলে ভেসে বেড়ানো, কোরবানির হাট- এ সব কিছু সভ্যতার আলোতে হারিয়ে গেছে। এখন চারদিকে ব্যস্ত মানুষ, ব্যস্ত পৃথিবী ঢেউয়ে ঢেউয়ে পথ খোঁজা, পাখীরা আপন ডানায় ঘুরছে বিশ্বময়। জীবনযুদ্ধে এখন আমাদেরকেও ডানা মেলতে হবে। কেননা এই শহরে এখন দারুন যন্ত্রনা। রাস্তা ট্রাফিক জ্যামে আটকা , হাসপাতালে নেই আরাম, সব খাবারে ভেজাল, কালো ধোঁয়ায় অক্সিজেন জব্দ। মশার দাপটে ডেঙ্গু, সন্ত্রাসীরা চুমার করছে সাজানো সংসার, ঘুষ খোরেরা গড়ছে আলিশান বাড়ি। আবার উত্তাল রাজপথ; স্বপ্নদেখা মানুষের বিদ্রোহ। হাজার শাড়ী-গহনা, জনে জনে গাড়ি। সীতারা এখন অগ্নি পরীক্ষার ভয়ে- খোঁজে রাম, হনুমান, লক্ষণকে। কে দেবে তাদের পাহাড়া, কামনার চোখ যৌন ডাকাতদের। কেবল যানবাহনে নয়; রাতের আধাঁরেও সিঁধ কেটে ঘর লুট করে যৌন ডাকাতদল; কেড়ে নেয় গৃহবধুর সম্ভ্রম। শহরের দামী হোটেলে প্রলোভন দেখিয়ে উচ্চবিত্ত বেহায়া যৌনডাকাত ছলনায় খুবলে খায় নারী দেহ। এ যেন সভ্য যুগের অসভ্য পৃথিবী। যুদ্ধ ছাড়া অস্ত্র বাজার বিশ্বে জমেনা। ঢালছে মেধা অস্ত্র গবেষনায়। মানুষের রক্ত দেখে মানুষ করে উল্লাস। বাতাস ভারী হয় আহত মানুষের চিৎকারে। আবার মানুষের ধ্বংসযজ্ঞে ধংস হয় অরণ্য।
বিশ্ব কাঁপানো বিশ্ব মহামারী করোনার, আগমনে আলোর নগরী অন্ধকারে ঢেকে গেছে; নেমেছে মৃত্যুপুরী। বিমান বন্দরে বন্দি বিমান, আকাশে ওড়ে না। অভিশপ্ত মহামারী একজন থেকে আরেকজনকে দূরে সরিয়ে দিল। ১৪২৭ সালে রমনা বটমুলে লাল পেড়ে সাদা শাড়ীতে আসেনি কেউ। শাহবাগে শূণ্যতা, ্ঋষিজের গান নেই; নেই কোথাও কোনো বে-হিসাবি চায়ের আড্ডা,সব স্থবির। বিষমাখা করোনা বদলে দিয়েছে পৃথিবী। খবরে আসে লাখ লাখ চলে গেছে কবরে। সাদা-কালো কাউকেই ছাড়ে না করোনা। কেবলই মন থেকে চাওয়া ধুয়েমুছে যাক বিষমাখা করোনা। লাটিমের মতো পৃথিবীটা ঘুরছে। অমানবিক মূল্যহীন নির্লজ্জ অহংকারে। এর পরেও থামেনা বৈষম্য। চারদিকে বৈষম্য। শতঝঞ্ঝা পঙ্কিলতা মুছে গড়তে হবে সমাজ। মাটির মুক্তিসেনা তোমরাই হবে কান্ডারী। আর রক্ত দেবো না। প্রিয় প্রতিষ্ঠানের চত্তরে স্মৃতির মিনার আর বানাবো না। লক্ষ প্রানের দামে কেনা বর্ণিল স্বাধীনতা বিবর্ণ হয়ে যায় দারিদ্রের কষাঘাতে, কলম থামাতে চায় স্বৈরাচারের হাত। ভাষার উপর হানে আঘাত। প্রতিবাদে মিছিল; প্রতিরোধে মৃত্যু। সড়কের যানবাহন হয়ে গেছে যন্ত্র দানব, গতি বেপরোয়া, নিয়ন্ত্রনহীন। কবি মরণকে অন্তিম সুহৃদের সাথে মিলন হিসেবে দেখেছেন। আর্ত হৃদয়ের সে আর্তিকেও তিনি কবিতায় ধারণ করেছেন। কবির কবিতার রসাস্বাদন করতে হলে, মনে রাখতে হবে,তার সকল কথার মর্মমূলে রয়েছে পেছনের দেখা সত্য সুন্দর সব কিছু হারিয়ে গেছে- আক্ষেপে ভরা তার বর্তমান জীবন।
শতবর্ষ আগের ডাকঘর, খাকি পোশাকের ডাকপিয়ন নেই। নেই সেই জ্যোতিষী যিনি বলে দিতেন ভাগ্যের গতি। পাখির কুজনে এখন আর ভোর হয় না। সবই যেন বদল হাওয়ায় বদলে গেছে। কবির কবিতায় রয়েছে ষড়ঋতুর বর্ননা, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বর্ণনা। এ পৃথিবীটা একটা খেলার মাঠ। খেলতে খেলতে হঠাৎ দেখেন বেলা শেষ। কবি ভাবেন বাবার স্বপভরা দু’চোখে নির্মিত পথে পথচলা। ফসলের জমিতে লেখা হয়েছে অধিকারে কবির নাম। এখন নতুন স্বপ্নের গানে মুখরিত জনপদ। সোনালী ফসলে ভরে উঠবে বিবর্ণ মাঠ।
বলতে আমার আনন্দ হচ্ছে, ফজলুল হক রোকনের ‘বদল হাওয়ায় বদলে গেছে দিন’ কবিতার বইটি আমার পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। গ্রন্থটি পাঠকের জন্য বাড়তি পাওনা। কবির এটি দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। ২০২৫ সালের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে। প্রচ্ছদ একেঁছেন স্বজন মজুমদার, প্রকাশক তুহিন ভূইয়া। প্রকাশনী সংস্থা নির্বাণ প্রকাশ। গ্রন্থটির পরিবেশক পানকৌড়ি , কাটাবন, ঢাকা। অনলাইন পরিবেশক রকমারি.কম। মুদ্রণ হয়েছে খাঁজা প্রিন্টিং এন্ড বাইন্ডিং ফকিরের পুল, মতিঝিল, ঢাকা।
কবি গ্রন্থখানা উৎসর্গ করেছেন তার দুঃখ সুখের সাথী জীবনসঙ্গীকে। কবির কোনো লেখালেখিতেই বাহ্যিকভাবে তার একেবারেই সমর্থন নেই। আর কবিও তার অন্তরের কথা জানেন না। কিন্তু কবি এতটুকুন বোঝেন যে তার সকল দু:খ সুখের সাথী তিনি। কবির সামান্য সফলতায়, সামান্য সুখে তার অন্তরে হাসি ফোটে। কবিতায় কবির ব্যক্তি মানুষের জীবনবোধ স্বততউচ্চারিত হয়েছে অপকট শব্দ বিন্যাসে। কবি তার জীবনের অভিজ্ঞতা ও সময়ের বাস্তবতাকেই রূপ দিয়েছেন তার কবিতায়। শুধু মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কই নয়, প্রকৃতির সাথে মানব জীবনের নিবিড় নৈকট্যের কথাও উচ্চারিত হয়েছে তার কবিতায়। গাছগাছালির সাথে মানুষের ভালবাসার কথাও তার কবিতায় স্থান পেয়েছে। বাস্তবতার প্রতিটি স্তরকে তিনি সুক্ষè বিবেচনায় বিচার করছেন। মানুষের জীবন-আচরণের সকল বিষয়গুলো তার কবিতায় স্থান পেয়েছে। দৈনন্দিন জীবন যাপনের যাবতীয় দিক কবিতার ছত্রে ছত্রে নিপুণতার সাথে মনের তুলিতে অঙ্কন করেছেন কবি। জীবনের চলার পথের অভিজ্ঞতার কথা, উপলদ্ধির কথা সরল সোজা ও প্রত্যক্ষ উচ্চারণে রচনা করেছেন তিনি তার কবিতা। সোজাসুজিই তিনি তার নিজের অনুভূতির কথা বলতে ভালোবাসেন। সে উচ্চারণ সহজ ও ঋজু , জীবনের নানা উপলদ্ধিও প্রকাশে সমুজ্জ্বল।
লেখক: কামরুন-নাহার-মুকুল, কলামিষ্ট, নাট্যকার এবং গবেষক।
