মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬, ০৪:৩৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
যৌনকর্মীদের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের আহ্বান ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যাংক ঋণের প্রায় অর্ধেকই খেলাপি বন্দরে অবৈধ গ্যাস ব্যবহারবিরোধী অভিযান: তিন স্পটে এক লাখ টাকা করে জরিমানা ছাত্র বা সন্তানের বয়সি কর্মকর্তারাও ‘স্যার’ সম্বোধন শুনতে চান নরসিংদী জেলা পুলিশের মাসিক কল্যাণ সভা ও অপরাধ পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত পঙ্গু হাসপাতালে বেগম খালেদা জিয়ার নামে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মোড়ক উন্মোচন ও পিঠা উৎসব অনুষ্ঠিত প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাৎ শেষে নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করল এনসিপি বৈষম্য ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশের পথে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিন: প্রধান উপদেষ্টা নরসিংদীর বেলাবোতে দুই ব্যবসায়ীর ঝগড়ায় একজনের মৃত্যু, ভাঙচুর-আগুন জুয়ার আসরে অভিযান, ১২ জুয়ারিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ

যৌনকর্মীদের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক:
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬

এসডব্লিউএনবি-সমকাল গোলটেবিল

যৌনকর্মীদের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের আহ্বান

যৌনকর্মীদের অধিকার, মর্যাদা ও  ন্যায়বিচার নিশ্চিতের আহ্বানরাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল কার্যালয়ে গতকাল সোমবার ‘ যৌনকর্মীদের প্রতি সহিংসতা ও আইনি সুরক্ষা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় অতিথিরা সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

 প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৪৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে যৌনকর্মীরা প্রতিনিয়ত সহিংসতা, নির্যাতন ও বৈষম্যের মুখে পড়ছেন। খদ্দের ও দালালের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। রাষ্ট্রীয় নীতি, আইন ও উন্নয়ন কর্মসূচিতে এ জনগোষ্ঠীর কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই।

যৌনকর্মীদের ওপর নির্যাতন, সামাজিক ও আইনি সুরক্ষার এমন ঘাটতির বিষয়গুলো উঠে এসেছে রাজধানীতে আয়োজিত একটি গোলটেবিল আলোচনায়। এতে অংশ নিয়ে বেশ কিছু সুপারিশও তুলে ধরেছেন বিশিষ্টজন। তারা যৌনকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত বৈষম্যমূলক আইন ও বিধিমালা সংশোধন করে আইনি স্বীকৃতি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ভাতাসহ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে তাদের অন্তর্ভুক্তি, জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার ব্যবস্থা সহজ করা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে বিকল্প জীবিকা ও অথনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফুরকান হোসেন। এরপর একটি ভিডিও দেখানো হয়। তাতে যৌনকর্মীদের ওপর নির্যাতনের চিত্র দেখে উপস্থিত আলোচকদের চোখ ভিজে যায়। দেখা যায়, বেশির ভাগ নির্যাতনের ঘটনায় স্থানীয় সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী ও প্রভাবশালীরা জড়িত।

মূল প্রবন্ধে ফুরকান হোসেন বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনকালে শতভাগ নারী যৌনকর্মী কোনো না কোনো সহিংসতার শিকার হয়েছেন। গত ১২ মাসে ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ শারীরিক সহিংসত এবং ৯১ শতাংশ মৌখিক নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। এই সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের তালিকায় রয়েছে পুলিশ, খদ্দের, দালাল, বাড়িওয়ালা, স্থানীয় লোকজন; এমনকি পরিবারের সদস্যরাও।
ইউএনএইডস ও এসডব্লিউএনের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ৯৬ শতাংশ যৌনকর্মী জীবনে অন্তত একবার পুলিশের হয়রানি, নির্যাতন, চাঁদাবাজি বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যরা বিনা পারিশ্রমিকে যৌন সম্পর্ক করতে বাধ্য করেন অথবা ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করেন। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা টাকা না দিয়ে যৌন সম্পর্ক করলেও পুলিশ সাধারণত কোনো ব্যবস্থা নেয় না।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশে যৌনকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে আইনগত অস্পষ্টতা ও দ্বন্দ্বপূর্ণ বাস্তবতার মধ্যে বাস করছেন। একদিকে যৌনকর্ম কার্যত সহনীয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, অন্যদিকে জীবিকা নির্বাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডগুলো বিভিন্ন আইনে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ যৌনকর্মী গ্রেপ্তার বা আটক হয়েছেন; তাদের মধ্যে ৪৯ দশমিক ১ শতাংশ কারাবরণ করেছেন, ২৫ দশমিক ৩ শতাংশ আটক ছিলেন থানায়। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সংবিধানের মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ফুরকান হোসেন বলেন, সহিংসতা বা পারিশ্রমিক না পাওয়ার ঘটনায় যৌনকর্মীরা পুলিশের কাছে গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সহায়তা পান না। গবেষণায় দেখা গেছে, ১০ শতাংশের কম যৌনকর্মী আইনি সহায়তা চেয়েছেন; বাকিরা পুলিশের প্রতিশোধের ভয়ে অভিযোগই করেননি। এ ছাড়া ৭৯ দশমিক ৫ শতাংশ যৌনকর্মী জীবনে অন্তত একবার উপার্জিত টাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন। যার মধ্যে ১৯ শতাংশ ক্ষেত্রে বাধ্য করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

২০১১ সালের নারী উন্নয়ন নীতি কিংবা নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (এনএপিভিএডব্লিউ) কোনোটিতেই যৌনকর্মীদের স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে তারা
সরকারি সুরক্ষা, সেবা ও ক্ষমতায়ন কর্মসূচির বাইরে থেকে যাচ্ছেন।

গবেষণায় উঠে এসেছে, ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশ যৌনকর্মী নিজেদের মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত মনে করেন। ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ যৌনকর্মীর সন্তান রয়েছে। সামাজিক কলঙ্ক ও অর্থনৈতিক সংকটে তাদের অনেকেই স্কুল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। সরকারি শিশু যত্নকেন্দ্র বা আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এসব শিশুর জায়গা হয় না।

এসডব্লিউএনবির সভানেত্রী নুর নাহার বলেন, ‘যৌনকর্মীকে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা পাওয়া আমাদের অধিকার। সমাজে খদ্দেরকে প্রশ্ন করা হয় না, কিন্তু যৌনকর্মীকে প্রশ্ন করা হয়। এই বৈষম্য বন্ধ হওয়া দরকার।’

উল্কা নারী সংঘের সভানেত্রী হেনা আক্তার বলেন, ‘দেশে যৌনকর্মীর সংখ্যা আনুমানিক এক লাখ ১৩ হাজার। এই সংখ্যার মধ্যে নারী ও পুরুষ উভয় যৌনকর্মীই রয়েছেন। কিন্তু আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ কার্যত আইনি স্বীকৃতি ও সুরক্ষার বাইরে
থেকে যাচ্ছে।

নারীপক্ষের সদস্য জাহানারা বলেন, আমরা সবাই মনে করি, ‘সেক্স ওয়ার্কার’ বিষয়টিকে স্বীকৃতি দিতে হবে। যাদের বয়স ১৮ বছরের বেশি এবং যারা এ পেশাকে তাদের আয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে সেক্স ওয়ার্ককে স্বীকার করা অবশ্যক।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পরিচালক নিশাত সুলতানা বলেন, যৌনকর্মী, হিজড়া ও দলিত– এই প্রতিটি সম্প্রদায়ের ওপরই নির্যাতন ও বৈষম্য চলছে। নারীরা ঘরের ভেতরেও নিরাপদ নন। সরকার যদি নিজেই স্বীকার করে– দেশের ৭০ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার, তাহলে প্রশ্ন আসে, আমরা সমাজ হিসেবে কোন পথে এগোচ্ছি?
তিনি বলেন, অধিকারভিত্তিক কণ্ঠস্বরকে দুর্বল করার জন্য অনেক সময় ধর্মের দোহাই দিয়ে ভয় দেখানো হয়। এতে যৌনকর্মীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ আরও চুপসে যেতে বাধ্য হন।
ইউএনএইডসের কান্ট্রি ডিরেক্টর সায়মা খান বলেন, দেশে এখন একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যারা নিজেদের ‘মরাল পুলিশ’ মনে করে। নারীদের যৌনতা, পোশাক, আচরণ, চলাফেরা– সবকিছুর ওপর তারা কর্তৃত্ব ফলাতে চায়। এই গোষ্ঠীর ধারণা, যেহেতু তারা কোনো কাজকে ‘ভুল’ মনে করে, তাই সেটি বন্ধ করতে গালাগাল, নির্যাতন এমনকি মারধর করাও বৈধ। রাস্তায় প্রকাশ্যে যৌনকর্মীকে ধরে পেটানো হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে নারীকে নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি সুপরিকল্পিত সামাজিক নকশা।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, নারী অধিকার সংস্কার-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে যখন সেক্স ওয়ার্ককে বৈধ করার প্রসঙ্গ এসেছে, তখন সেটি নিয়ে নানা ধরনের আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছে। যৌনকর্মীকে রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাদের উচ্ছেদ করার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
তিনি বলেন, যৌনকর্মীর সন্তানের যদি শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা যায়, তবে তারাও সমাজের উৎপাদনশীল নাগরিক হয়ে উঠতে পারে। শাহীন আনাম মনে করেন, সংবিধান অনুযায়ী পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে টেনে ওপরে আনা সরকারের দায়িত্ব। ভবিষ্যতে যে সরকার ক্ষমতায় আসবে, তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে নাগরিক সমাজকে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হতে হবে।

 

ভালো লাগলে নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2011-2025 VisionBangla24.Com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com