শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫৩ অপরাহ্ন
দেশজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটের এই ক্রান্তিকালে মহাসড়ক সংলগ্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর অনিয়মের চিত্র। সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে রাতের আঁধারে বিশাল কন্টেইনার ও লরিতে গ্যাস ভরার মাধ্যমে চলছে এক প্রভাবশালী অসাধু সিন্ডিকেটের রমরমা বাণিজ্য। এতে সাধারণ যানবাহন চালকরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে মহাসড়কে বাড়ছে মারাত্মক দুর্ঘটনার আশঙ্কা। সম্প্রতি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ‘সেবা সিএনজি পাম্প’-এ সংঘটিত এমন অনিয়মের বেশ কিছু ভিডিও ফুটেজ ও তথ্য-প্রমাণ গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে এসেছে, যা বিষয়টির ভয়াবহতা নতুন করে সামনে এনেছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দিনভর স্বাভাবিক কার্যক্রম চললেও রাত গভীর হলেই পাম্পটির পরিবেশ আমূল বদলে যায়। মধ্যরাত পেরোলেই পাম্পের প্রধান ফটকের আলো কমিয়ে দেওয়া হয় এবং গোপনে প্রবেশ করানো হয় কয়েকশ সিলিন্ডার বহনকারী বড় বড় কন্টেইনার ও লরি। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাস ভরার কার্যক্রম। একেকটি কন্টেইনার পূর্ণ করতে কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যাওয়ায় পাম্পের গ্যাস প্রেশার মারাত্মকভাবে কমে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর।
এ সময় লাইনে অপেক্ষমাণ প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও অন্যান্য যানবাহনের চালকদের ‘গ্যাসের প্রেশার নেই’ বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় গ্যাস না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একজন ভুক্তভোগী চালক বলেন, “আমরা ২০-৩০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ৫ কেজি গ্যাস পাই না, অথচ একই সময়ে বিশাল কন্টেইনারে হাজার হাজার কেজি গ্যাস ভরে নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের চোখের সামনে এমন অনিয়ম কীভাবে চলে, তা আমাদের বোধগম্য নয়।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের কার্যক্রম শুধু অনিয়মই নয়, বরং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। খোলা কন্টেইনারে বা অনুমোদনবিহীন সিলিন্ডারে গ্যাস ভরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। বিস্ফোরণ বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে শত শত সিলিন্ডারে গ্যাস ভরে মহাসড়কে পরিবহন করা মানে কার্যত একটি ‘চলন্ত বোমা’ নিয়ে চলাচল করা। সামান্য লিকেজ, ঘর্ষণ বা অসাবধানতাজনিত কারণে মুহূর্তেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটতে পারে, যা আশপাশের বিশাল এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে সক্ষম।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, শিল্পকারখানাগুলোর অনেকেই সরাসরি গ্যাস সংযোগ না পেয়ে এই অবৈধ উৎসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে কালোবাজারির মাধ্যমে গ্যাস কেনাবেচার একটি শক্তিশালী চক্র তৈরি হয়েছে। পাম্প মালিকদের জন্য এটি অত্যন্ত লাভজনক হওয়ায় তারা নিয়ম ভেঙে কন্টেইনারে গ্যাস সরবরাহে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। সাধারণ যানবাহনে গ্যাস বিক্রির তুলনায় কন্টেইনারে গ্যাস সরবরাহ করে তারা কয়েকগুণ বেশি মুনাফা অর্জন করছেন। তদারকির ঘাটতি ও নিয়মিত অভিযান না থাকায় এই সিন্ডিকেট দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সিএনজি ফিলিং স্টেশনের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও নিয়মিত অভিযান জোরদারের আশ্বাস দেন তারা।
জ্বালানি খাতের এই অনিয়ম শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, জননিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ এবং নিয়মিত নজরদারি ছাড়া এই অবৈধ গ্যাস বাণিজ্য বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।