নিশ্চুপ বিএসইসি ও আইডিআরএ
আত্মগোপনে থেকেও ইসলামী ইন্স্যুরেন্সে সাঈদ খোকনের দাপট
ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে করপোরেট গভর্ন্যান্স লঙ্ঘন, বোর্ড পরিচালনায় অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে পৃথক তদন্ত শেষ হলেও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়নি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) পক্ষ থেকে দীর্ঘ দিনেও কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় বীমা খাতে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলার আসামি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে রয়েছেন সাঈদ খোকন। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে না গেলেও অজ্ঞাত স্থান থেকে কোম্পানির কার্যক্রমে তার প্রভাব বজায় রেখেছেন। এমনকি নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে গত ২৪ জুন অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় তিনি অনলাইনে যুক্ত হয়ে অংশ নেন। ওই সভায় ১৬ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আইডিআরএ-এর নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালকদের সভায় সশরীরে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক হওয়ায়, সাঈদ খোকনের ভার্চুয়াল অংশগ্রহণ এবং ওই সভার সিদ্ধান্তগুলোর আইনি বৈধতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় সাঈদ খোকনের হয়ে নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন তার চাচা ও কোম্পানিটির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ঈসমাইল নওয়াব।
এই অনিয়মের সূত্র ধরে কোম্পানির সাতজন উদ্যোক্তা পরিচালকের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত বছরের ৯ নভেম্বর বিএসইসি চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। অতিরিক্ত পরিচালক মো. ফারুক হোসেনের নেতৃত্বাধীন এই কমিটিকে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। তদন্ত শেষ হওয়ার পরও কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপের তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তদন্তে চেয়ারম্যান হিসেবে সাঈদ খোকনের দীর্ঘ ১৩ বছরের একছত্র দায়িত্ব পালন, বোর্ড অনুমোদন ছাড়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উদ্যোক্তা পরিচালক অপসারণ করে নিজের পরিবারের সদস্যদের পরিচালক নিয়োগ, কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের খামখেয়ালিমতো নিয়োগ ও অপসারণ এবং আইন লঙ্ঘন করে আত্মগোপনে থেকে কোম্পানি পরিচালনার মতো গুরুতর বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হয়।
একই বিষয়ে গত বছরের ১৩ নভেম্বর আইডিআরএ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মাহফেল হক অ্যান্ড কোম্পানিকে বিশেষ তদন্তের দায়িত্ব দেয়। এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ থাকলেও এখন পর্যন্ত সেই তদন্তের ফলাফল বা পরবর্তী কোনো পদক্ষেপের কথা অন্ধকারেই রয়ে গেছে। বিএসইসিতে দেওয়া অভিযোগে ভুক্তভোগী পরিচালকেরা দাবি করেন, ২০১২ সালে চেয়ারম্যান হওয়ার পর সাঈদ খোকন কোম্পানিতে একক রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সাতজন স্পন্সর পরিচালককে অন্যায়ভাবে অপসারণ করে নিজের পরিবারের সদস্য ও নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের বসিয়েছেন, যারা বর্তমানে প্রায় ৩০ দশমিক ৩৫ শতাংশ শেয়ার নিয়ন্ত্রণ করছেন, যা সম্পূর্ণ প্রচলিত আইনের পরিপন্থী। এছাড়া নিজের সিদ্ধান্তে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা এবং কোম্পানি সচিব নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষেত্রে কোম্পানির সচিব ও পরিচালক নুর মোহাম্মদ মামুন তাকে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এমন পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, অপসারিত উদ্যোক্তা পরিচালকদের পুনর্বহাল এবং পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের দাবি জানিয়ে আইডিআরএ-এর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন এবং বিএসইসি-এর চেয়ারম্যান মাসুদ খানের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন অভিযোগকারী পরিচালকেরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইডিআরএ-এর উচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন শীর্ষ পদ খালি থাকায় অনেক বিষয়েই এতদিন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে যেহেতু সম্প্রতি নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ হয়েছে, তাই কর্তৃপক্ষ এখন এই বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।