নরসিংদী খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ে তোলপাড়
বন্ধ মিলের নামে ১০০ টন গম বরাদ্দ
বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও উৎপাদন বন্ধ থাকা একটি ফ্লাওয়ার মিলের নামে ১০০ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ ও তা আত্নসাতের অভিযোগ উঠেছে নরসিংদী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকা স্বত্ত্বেও কাগজপত্রে আটা সরবরাহের দাবি তুলে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই ঘটনার পর খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও মিল মালিক একে অপরের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছেন।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, নরসিংদী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অধিদপ্তরের আওতায় তালিকাভুক্ত ৪টি ফ্লাওয়ার মিল সরকারি গুদামের গম পেষণ করে আটা সরবরাহ করে থাকে। মিলগুলো হলো— কারারচরের মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিল, চৈতনার মেসার্স এস আফরিন ফ্লাওয়ার মিল এবং নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জের মেসার্স রহিমা ফ্লাওয়ার মিল ও মেসার্স মীম শরৎ ফ্লাওয়ার মিল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিবপুরের কারারচর অবস্থিত 'মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিল' বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় গত বছরের ৭ জুন থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এছাড়া ঈদুল আযহার পূর্ব থেকেই কারখানাটি পুরোপুরি বন্ধ। অথচ অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে গত ১৩ জুলাই (সিডিভি/আইআর/এস.এ.ও নং-২৬২৭-০০০৩২৮৫৬৮৪, ডিও নং-০১০৪৫৩) বন্ধ এই মিলটির অনুকূলে ১৯ লাখ টাকা মূল্যের ১০০ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। চালানে স্বাক্ষর করেন মিলের মালিক মো: মিরাজ আলম ভূঞা এবং অনুমোদন দেন নরসিংদী সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জান্নাতি ময়না।
বিদ্যুৎ ও উৎপাদনবিহীন একটি কারখানায় কীভাবে গম বরাদ্দ দেওয়া হলো—বিষয়টি জানাজানি হলে তোলপাড় শুরু হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে খাদ্য অধিদপ্তর তড়িঘড়ি করে ২৬ জুলাই উপ-বরাদ্দকৃত ১৭৬.৬০০ মেট্রিক টন গমের বাকি অংশ (৭৬.৬০০ মেট্রিক টন) অন্য তিনটি মিলে পুনর্বরাদ্দ দেয়।
সরেজমিনে কারারচরের মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলে গিয়ে কারখানাটি সম্পূর্ণ বন্ধ ও বিদ্যুৎহীন পাওয়া যায়। বিদ্যুৎ ছাড়া কীভাবে পেষণ সম্ভব হলো— এমন প্রশ্নের জবাবে মিল মালিক মিরাজ আলম ভূঞা দাবি করেন, তিনি অন্য কারখানা থেকে গম পেষণ করে গুদামে জমা দিয়েছেন। তবে স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সরকারি নিয়ম ভেঙে বন্ধ মিলের নামে বরাদ্দ নিয়ে যোগসাজশের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি গম হরিলুট করা হয়েছে।
এ বিষয়ে নরসিংদী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছালেহ উদ্দিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি নিজের দায় এড়িয়ে বলেন, "উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা বিস্তারিত বলতে পারবেন। কাগজপত্র প্রস্তুত করে আনলে আমি শুধু স্বাক্ষর করি। তবে বরাদ্দকৃত গম কীভাবে পেষণ হলো তা তদন্ত করা হচ্ছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
অন্যদিকে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জান্নাতি ময়না জানান, একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তদন্তে মিলের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও উৎপাদন বন্ধ থাকার সত্যতা মিলেছে। তবে মিল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আগে অফিসকে জানায়নি দাবি করে তিনি বলেন, বরাদ্দকৃত ১০০ মেট্রিক টন গম পেষণ করে আটা গুদামে জমা দেওয়া হয়েছে এবং অবশিষ্ট বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা একটি মিলের পেটে কীভাবে ১০০ টন গম চলে গেল, তা নিয়ে নরসিংদীর সুশীল সমাজ ও অভিজ্ঞ মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িত অসাধু কর্মকর্তা ও মিল মালিকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করছেন স্থানীয়রা।