দেশে এলএনজি সরবরাহে বিপর্যয়
গ্যাস সংকটে থমকে গেছে জনজীবন ও শিল্প উৎপাদন
কক্সবাজারের মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে হঠাৎ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে দেশজুড়ে এক অভূতপূর্ব গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। গত মঙ্গলবার টার্মিনালটির সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহে বড় ধস নামে। প্রতিদিন মোট সরবরাহকৃত গ্যাসের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আসে এলএনজি রূপান্তরের মাধ্যমে, যেখানে দৈনিক সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। তবে অগ্নিকাণ্ডের পর এই সরবরাহ নেমে এসেছে ৫০ কোটি ঘনফুটেরও নিচে। ফলে দিনে ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে যেখানে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছিল, তা এখন নেমে এসেছে ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে। সংকট এতটাই তীব্র আকার ধারণ করেছে যে, সাধারণ গৃহস্থালি রান্না থেকে শুরু করে সিএনজি স্টেশন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গার্মেন্টসসহ শিল্পকারখানায় স্থবিরতা নেমে এসেছে।
শিল্পকারখানা, বিশেষ করে টেক্সটাইল ও পোশাক খাতে এই তীব্র গ্যাস সংকট বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে এনেছে। উৎপাদন চালু রাখতে ন্যূনতম ১২ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে কারখানাগুলোতে তা কমে ২ থেকে ৪ পিএসআইয়ে ঠেকেছে, যা অনেক ক্ষেত্রে শূন্যেও নেমে আসছে। গাজীপুর, নরসিংদী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো শিল্পঘন এলাকাগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুতের যৌথ সংকটে উৎপাদন ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। গাজীপুরের সাড়ে তিন হাজার শিল্পকারখানার প্রায় ২০ লাখ শ্রমিক এবং কারখানা মালিকরা চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। নরসিংদী ও গাজীপুরের কারখানা উদ্যোক্তারা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপের অভাবে শ্রমিক ও অপারেটরদের বসিয়ে রাখতে হচ্ছে, কিন্তু মাস শেষে বেতন ঠিকই দিতে হবে। বিটিএমএ সূত্রে জানানো হয়েছে, উৎপাদন বন্ধ থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক পোশাক বা ক্রয়াদেশ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে শ্রমিকদের সাময়িক ছুটি দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। গাজীপুরের কোনাবাড়ী ও আমবাগ এলাকার বড় টেক্সটাইল মিলসহ বেশ কয়েকটি গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
জনজীবনেও এই সংকটের প্রভাব পড়েছে মারাত্মকভাবে। রাজধানীর ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ না থাকায় শত শত গাড়ি ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছে। অনেক স্টেশনে গ্যাস বিক্রি একেবারেই বন্ধ। একই সাথে বাসাবাড়িতে রান্নার চুলা না জ্বলায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে ঢাকার মোহাম্মদপুর, কাফরুল, মিরপুর ও ধানমন্ডি এলাকায় দিনের পর দিন চুলা জ্বলছে না। বিদ্যুৎচালিত ইন্ডাকশন চুলা কিনে কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষ মাটির চুলায় লাকড়ি জ্বালিয়ে রান্নার চেষ্টা করছেন। তিতাস গ্যাস কতৃপক্ষ জানিয়েছে, এলএনজি সরবরাহ কমার পর তিতাসের নেটওয়ার্কেই দিনে ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে, গ্যাসের ঘাটতির কারণে দেড় হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে, যার ফলে তীব্র গরমের মধ্যে দেশজুড়ে দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি)।
এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এক্সিলারেট এনার্জি টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু করতে আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে। তবে যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা কারিগরি বিশেষজ্ঞ দল পুড়ে যাওয়া বৈদ্যুতিক তার ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ নতুন করে সংযোজনের কাজ করছে। আশা করা হচ্ছে, টার্মিনালের অক্ষত বয়লারটি চালু করতে পারলে আগামী সপ্তাহের মধ্যে দৈনিক অতিরিক্ত ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহে যোগ হতে পারে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কারিগরি দল নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে এবং সরকার নিয়মিত নজরদারি রাখছে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু এলএনজি বা আমদানিনির্ভর নীতি দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অতীতেও ঘূর্ণিঝড় বা কারিগরি ত্রুটির কারণে সামিটের টার্মিনাল দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস বন্ধ ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাসমান টার্মিনালের বদলে স্থলভাগের টার্মিনাল নির্মাণ এবং সাগরে ও স্থলে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ সংস্কারের কাজে বিগত কয়েক দশকের অবহেলাই আজকের এই জাতীয় সংকটের মূল কারণ।