ঢাকা    মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভিশন বাংলা ২৪

নীরব বন বিভাগ

মনিপুর বিটে আব্দুল মান্নানের ‘রামরাজত্ব’!


নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক

মনিপুর বিটে আব্দুল মান্নানের ‘রামরাজত্ব’!

> ডিমার্কেশন ছাড়াই বনভূমিতে গোডাউন-বাড়ি, উচ্ছেদের পর ফের ৮৬ ঘর নির্মাণের অভিযোগ 


> বনজমি দখলে নেপথ্যে অর্থ লেনদেন, ৭০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার দাবি স্থানীয়দের 


> ২৪ ঘণ্টায় বাড়ি ভাঙার নির্দেশ, সপ্তাহ পেরোলেও বহাল স্থাপনা

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর

গাজীপুরে রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের মনিপুর বিটে বন বিভাগের জমি দখল করে একের পর এক স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও সুবিশাল টাইলসের গোডাউন, কোথাও চারতলা ভবন, আবার কোথাও ছয়তলা ভবনের ভিত্তির ওপর নির্মাণকাজ চলছে। অভিযোগের বড় অংশই হলো—বনভূমির সীমানা নির্ধারণ বা ডিমার্কেশন না করেই এসব স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

শুধু নতুন স্থাপনা নির্মাণ নয়, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযানে সরিয়ে দেওয়া ঘরও ফের নির্মাণ করা হয়েছে বলে সরেজমিনে তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে এই প্রতিবেদক। স্থানীয়দের দাবি, ৫ আগস্টের পর আশ্রমচালা এলাকায় উচ্ছেদ হওয়া ঘরগুলোর জায়গায় গত দুই মাসে প্রায় ৮৬টি ঘর নতুন করে নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ঘর নির্মাণে ঘরপ্রতি ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, এভাবে প্রায় ৭০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ ছাড়া এত ব্যাপকভাবে বনভূমি দখল ও স্থাপনা নির্মাণ সম্ভব নয়। বিশেষ করে সদ্য বিদায়ী মনিপুর বিট কর্মকর্তা ডেপুটি রেঞ্জার আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে বনভূমি দখল ও স্থাপনা নির্মাণে সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিটের ক্যাশিয়ার ও বনপ্রহরী মাসুমের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে।

ডিমার্কেশন ছাড়াই টাইলসের বিশাল গোডাউন:

মনিপুর বিটের জেসন গেইটসংলগ্ন নৌলাপাড়া পুরনো মসজিদের বিপরীতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ব্রিজের পূর্ব পাশে টাইলস ব্যবসায়ী রওশনের একটি বড় গোডাউন নির্মাণের কাজ চলছে বলে সরেজমিনে দেখা গেছে।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রওশনের আদি বাড়ি সিলেটে এবং তিনি স্থানীয় জিয়াদের পরিবারের ঘরজামাই।

অভিযোগ রয়েছে, এর আগে মনিপুর বিট কর্তৃপক্ষ তাকে ওই স্থানে কোনো স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেয়নি। কিন্তু বর্তমানে অর্থের বিনিময়ে বিট কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান তাকে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

স্থানীয় সূত্রের আরও দাবি, বিট কর্মকর্তা মান্নানের পরামর্শেই দিনের বেলা নির্মাণকাজ না করে রাতভর বিপুলসংখ্যক শ্রমিক দিয়ে গোডাউনটির নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে বিটের ক্যাশিয়ার ও বনপ্রহরী মাসুমের বিরুদ্ধেও অর্থের বিনিময়ে নির্মাণকাজে সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে। গোডাউন নির্মাণে জোতের পাশাপাশি বনেরজমিও যুক্ত করেছেন রওশন,দাবি বিশেষ সূত্রের।

তবে এ অভিযোগের পাশাপাশি জমির সীমানা নির্ধারণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, একই দাগের জমির ডিমার্কেশনের জন্য বন বিভাগের কাছে আবেদন করা হলেও এখন পর্যন্ত সীমানা নির্ধারণ হয়নি। অথচ ডিমার্কেশন সম্পন্ন হওয়ার আগেই বনভূমি-সংলগ্ন বনের জমিসহ বিশাল স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে।

জমির বিবরণ অনুযায়ী—এসএ দাগ ৫৭৪ ও ৫৭৫; আরএস দাগ ১৬৭৯ ও ১৬৮৩। সরেজমিনে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট জমির দুই পাশেই ভাওয়াল গড়ের বনভূমি রয়েছে। ফলে সীমানা নির্ধারণ না করে স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ দিলে ভবিষ্যতে সরকারি বনভূমির অংশ স্থায়ীভাবে দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


সংরক্ষিত বনভূমির মাঝখানে চারতলা ভবন:

মনিপুর বিটের কাতলামারা এলাকার মন্দিরের বিপরীতে দক্ষিণ দিকে মনিপুরমুখী রাস্তার পাশে সংরক্ষিত বনভূমির মাঝখানে চারতলা ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। সরেজমিনে তা প্রত্যক্ষও করা গেছে।

কুমিল্লার সোহেল নামের এক ব্যক্তি জমিটির মালিকানা দাবি করে ভবন নির্মাণ করছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, ভবনটির দক্ষিণাংশের কিছু অংশ সংরক্ষিত বনভূমির মধ্যে চলে গেছে।

যথাযথ জরিপ ও ডিমার্কেশন ছাড়া নির্মাণকাজ চলতে থাকলে সরকারি বনভূমি স্থায়ীভাবে দখল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

হোতাপাড়ায় ছয়তলা ফাউন্ডেশন:

হোতাপাড়া বাসস্ট্যান্ডের অটোস্ট্যান্ডের পশ্চিম পাশে বাক্কির বাড়ি সংলগ্নও একই ধরনের অভিযোগ। চারদিকে ভাওয়াল গড়ের বনভূমি থাকা সত্ত্বেও ডিমার্কেশন ছাড়াই জালাল উদ্দিন মাস্টার নামে এক ব্যক্তির ছয়তলা ফাউন্ডেশনের ওপর দুইতলা নির্মাণকাজ চলছে বলে সরেজমিনে দেখা গেছে। বাড়ি নির্মাণে জোতের পাশাপাশি বনের জমি যুক্ত করেছেন জালালউদ্দিন,দাবি এলাকাবাসীর।

এর আগে হোতাপাড়া থেকে মনিপুরগামী মূল রাস্তার উত্তর পাশে ভাওয়ালগড় কেটে বনের জমিতে রাস্তা নির্মাণ করেছেন জালাল উদ্দিন মাস্টার। রাস্তাটি তাঁর বাড়িতে যাওয়ার জন্য নির্মাণ করা হলেও সংশ্লিষ্ট বিট রহস্যময় কারণে বাধা প্রদান করেনি, আইনগত ব্যবস্থাও নেয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বনভূমির সীমানা নির্ধারণ না করেই নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তারা।

প্রায় ৮ কাঠা জমিতে বাউন্ডারি, ডিমার্কেশন নেই:

মনিপুরে প্রয়াত সবুর মাস্টারের বাড়ির বিপরীতে এবং কফি হাউজের পূর্ব পাশে কয়েকদিন আগে প্রায় আট কাঠা জমিতে বাউন্ডারি নির্মাণ প্রত্যক্ষ করেছেন এই প্রতিবেদক। বাউন্ডারির ভেতরে বন বিভাগের জমির অংশও ঢুকে গেছে।

এ ঘটনায় 'বনের দালাল' নামে খ্যাত ইদুম আলী নামে স্থানীয় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বনভূমি দখলে মধ্যস্থতা করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ইদুম আলীর মধ্যস্থতায় জনৈক কহিনুর বেগম বায়নাসূত্রে ওই জমি কিনেছেন।

জমির বিবরণ—পরিমাণ ১৩ দশমিক ১৩ শতাংশ; খতিয়ান: সিএস-১৩১, এসএ-৩৪২, আরএস-১৯০; দাগ: এসএ-৩১০, আরএস-১০৩৮।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, জমির সীমানা নির্ধারণ না করেই কীভাবে এত বড় বাউন্ডারি নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হলো?

২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম, সপ্তাহ পেরিয়েও বহাল বাড়ি:

বেগমপুর কাজী মার্কেটের পশ্চিম পাশে পল্লী চিকিৎসক ডা. খোরশেদ আলমের একটি সুবিশাল বাড়ি নির্মাণ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিন ও জমির নথির সূত্রে দেখা গেছে, বাড়িটি বন বিভাগের জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে।

বার্তা পেয়ে মনিপুর বিট কর্মকর্তা ও রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের কর্মকর্তারা বিটের সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের পর বাড়িটি ভেঙে ফেলার জন্য ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেওয়া হয় বলে স্থানীয়রা জানান।

কিন্তু এক সপ্তাহের বেশি সময় পার হলেও বাড়িটি আগের অবস্থাতেই রয়েছে। এরপর এ বিষয়ে বন বিভাগের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।


উচ্ছেদ হলো, আবারও উঠল ঘর:

মনিপুর বিটের নয়াপাড়ার আশ্রমচালা এলাকায় বনভূমি দখলের চিত্র আরও উদ্বেগজনক।

৫ আগস্টের পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযানে বেশ কিছু ঘর সরিয়ে দেওয়া হয়। সরেজমিনে দেখা গেছে, উচ্ছেদের পর গত দুই মাসে একই এলাকায় প্রায় ৮৬টি ঘর নতুন করে নির্মাণ অথবা পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রতিটি ঘর নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণের জন্য ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। এ হিসাবে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের একাংশের দাবি, সব মিলিয়ে প্রায় ৭০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে পরিচিত একটি বিশেষ চক্রের বিরুদ্ধে বনভূমিতে ঘর নির্মাণে মধ্যস্থতার অভিযোগ রয়েছে। তাদের সঙ্গে মনিপুর বিট কর্মকর্তা আব্দুল মান্নানের যোগসাজশের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।

আরও অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের উচ্ছেদ অভিযানের জন্য বিট কর্মকর্তা মান্নান সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা খরচ বাবদ গ্রহণ করেছিলেন।

একদিকে উচ্ছেদ অভিযান, অন্যদিকে অর্থের বিনিময়ে একই এলাকায় ফের ঘর নির্মাণের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

উচ্ছেদের পর ফের নির্মাণের অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে

স্থানীয়দের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, উচ্ছেদ অভিযানে ঘর সরিয়ে নেওয়ার পর পুনরায় ঘর নির্মাণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে—উজ্জল, শ্রী সুবল, মো. সাদ্দাম, শ্রী সত্যেন, বলাই চন্দ্র বর্মন, জিয়া, সত্যেন্দ্র, কিবরিয়া, তোফাজ্জল হোসেন মন্টে, মো. হেলাল ও আবু তালেব।

এ ছাড়া উচ্ছেদের সময় ঘর খুলে রাখার পর একই এলাকায় পুনরায় স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে মো. আসাদ মাঝি, মো. সুমন, মো. হামিদ, মো. গিয়াস উদ্দিন, মো. শেফালী রানী, মো. সাদেক, শ্রী গোবিন্দ দেবনাথ, রতন রাজশাহী, শ্রী নিরঞ্জন ও লিপির বিরুদ্ধে। এদের ঘরবাড়ি আশ্রমচালা এলাকায়।

বনভূমিতে ঘরবাড়ির দীর্ঘ তালিকা:

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যে আশ্রমচালা এলাকায় আরও যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে বনভূমিতে ঘরবাড়ি নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে (এবং সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করা গেছে)  তারা হলেন—হারুন, আল আমিন, শুকুর আলী, বিল্লাল (তালা মেকার), মিজান, নজরুল, ইসলাম উদ্দিন, মনির, ফখরুদ্দিন, রুবেল, রাজশাহী জহির, জহির, নিত্য, লিটন রাজশাহী, অর্জুন, সমরঞ্জন, বোঝ, মর্জিনা, সুজন বংশী, আনন্দ, রঞ্জিত বংশী, রিপন বংশী, নিতাই, ফাতেমা, বিল্লাল, হানিফা, সাগর রাজশাহী, সুবল চন্দ্র বর্মন, নবী হোসেন, হযরত, যতীন বংশী, রিয়াজ, সুলতান, শরিফ, ফরিদ, মারফতের স্ত্রী, মহি, আব্দুর রহিম, নিতাই বংশী, স্বপন, রবীন্দ্র, সবিতা, চৈতি, লুৎফর বেপারী, ফরহাদ, ফওসিউল, রিয়াজুল, আব্দুল আউয়াল, খুশি, গৌরাঙ্গ, ইউনুস, লায়লা, ববিতা, রোকেয়া, হামিদ, ইসমাইল, গিয়াস উদ্দিন, শেফালী রানী, ফরিদ, জামির হোসেন, আশিক ও তাইজুল ইসলাম।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ঘর নির্মাণ-পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে ঘরপ্রতি ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। এসব টাকা স্থানীয় চিহ্নিত দালাল ও বিট কর্মকর্তা মান্নান এবং বিট ক্যাশিয়ার মাসুমের পকেটে গেছে বলে সূত্রের দাবি।

আইন কী বলছে:

বনভূমি নিয়ে এমন অভিযোগের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় বিদ্যমান আইনি কাঠামোর কারণে। বন আইন, ১৯২৭-এর ২৬ ধারায় সংরক্ষিত বনে অনুমতি ছাড়া ভূমি পরিষ্কার, চাষাবাদ বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে জমি ব্যবহারসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে শাস্তিযোগ্য করা হয়েছে। একই আইনের ২৩ ধারায় লিখিত সরকারি অনুমোদন ছাড়া সংরক্ষিত বনে কোনো নতুন অধিকার অর্জনের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।

বন কর্মকর্তাকে প্রয়োজনে জমি জরিপ, ডিমার্কেশন ও মানচিত্র তৈরির ক্ষমতাও আইনে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বনভূমির সীমানা নিয়ে বিরোধ বা অনিশ্চয়তা থাকলে যথাযথ জরিপ ও সীমানা নির্ধারণের গুরুত্ব রয়েছে। নিয়ন্ত্রিত বনভূমির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ডিমার্কেশনের বিধানও আইনে রয়েছে।

বনভূমি কমলে শুধু গাছ নয়, বিপন্ন হয় পুরো প্রতিবেশ:

পরিবেশবিদদের মতে, বনভূমির প্রান্তে একের পর এক বসতি, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও পাকা ভবন গড়ে উঠলে ক্ষতি শুধু জমির পরিমাণ কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বনভূমির খণ্ডীকরণে বন্যপ্রাণীর চলাচল ও আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মানুষের প্রবেশ বাড়ে এবং ভবিষ্যতে আরও দখলের পথ তৈরি হয়।

ভাওয়াল গড়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চলের ক্ষেত্রে তাই কোনো জমির মালিকানা বা দখল নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কাগজপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি দাগ, খতিয়ান, মৌজা ম্যাপ, আরএস/এসএ রেকর্ড এবং বন বিভাগের নিজস্ব সীমানা—সবকিছু মিলিয়ে যৌথ জরিপ করা জরুরি বলে মনে করছেন পরিবেশসংশ্লিষ্টরা।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:

অভিযোগের বিষয়ে সদ্য বিদায়ী মনিপুর বিট কর্মকর্তা ও ডেপুটি রেঞ্জার আব্দুল মান্নানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোনকল গ্রহণ করেননি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা সাইফুল বারী বলেন, ‘এতদিন বিট কর্মকর্তা বিটে ছিলেন, তখন আপনারা কেন কিছু জানাননি? এখন বদলি হয়ে যাওয়ার পর কেন বলছেন?’

অনুসন্ধান চলাকালে কোনো কর্মকর্তা বদলি হয়ে গেলে তাঁর বিরুদ্ধে আগের অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান বা ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না—এমন কোনো সরকারি বিধান আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উনি থাকাকালীন অভিযোগগুলো করলে ভালো হতো, তাই বললাম।’

তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারপরও যদি এ ধরনের কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. বশিরুল আল মামুনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি ফোনকল গ্রহণ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

একই বিষয়ে ঢাকা বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক মোহাম্মদ শামসুল আরেফীনের সঙ্গেও একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য পাঠিয়ে তাঁর বক্তব্যও জানতে চাওয়া হয়। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তিনিও কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।

ভিশন বাংলা ২৪

মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬


মনিপুর বিটে আব্দুল মান্নানের ‘রামরাজত্ব’!

প্রকাশের তারিখ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

> ডিমার্কেশন ছাড়াই বনভূমিতে গোডাউন-বাড়ি, উচ্ছেদের পর ফের ৮৬ ঘর নির্মাণের অভিযোগ 


> বনজমি দখলে নেপথ্যে অর্থ লেনদেন, ৭০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার দাবি স্থানীয়দের 


> ২৪ ঘণ্টায় বাড়ি ভাঙার নির্দেশ, সপ্তাহ পেরোলেও বহাল স্থাপনা


নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর


গাজীপুরে রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের মনিপুর বিটে বন বিভাগের জমি দখল করে একের পর এক স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও সুবিশাল টাইলসের গোডাউন, কোথাও চারতলা ভবন, আবার কোথাও ছয়তলা ভবনের ভিত্তির ওপর নির্মাণকাজ চলছে। অভিযোগের বড় অংশই হলো—বনভূমির সীমানা নির্ধারণ বা ডিমার্কেশন না করেই এসব স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

শুধু নতুন স্থাপনা নির্মাণ নয়, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযানে সরিয়ে দেওয়া ঘরও ফের নির্মাণ করা হয়েছে বলে সরেজমিনে তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে এই প্রতিবেদক। স্থানীয়দের দাবি, ৫ আগস্টের পর আশ্রমচালা এলাকায় উচ্ছেদ হওয়া ঘরগুলোর জায়গায় গত দুই মাসে প্রায় ৮৬টি ঘর নতুন করে নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ঘর নির্মাণে ঘরপ্রতি ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, এভাবে প্রায় ৭০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ ছাড়া এত ব্যাপকভাবে বনভূমি দখল ও স্থাপনা নির্মাণ সম্ভব নয়। বিশেষ করে সদ্য বিদায়ী মনিপুর বিট কর্মকর্তা ডেপুটি রেঞ্জার আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে বনভূমি দখল ও স্থাপনা নির্মাণে সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিটের ক্যাশিয়ার ও বনপ্রহরী মাসুমের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে।


ডিমার্কেশন ছাড়াই টাইলসের বিশাল গোডাউন:


মনিপুর বিটের জেসন গেইটসংলগ্ন নৌলাপাড়া পুরনো মসজিদের বিপরীতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ব্রিজের পূর্ব পাশে টাইলস ব্যবসায়ী রওশনের একটি বড় গোডাউন নির্মাণের কাজ চলছে বলে সরেজমিনে দেখা গেছে।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রওশনের আদি বাড়ি সিলেটে এবং তিনি স্থানীয় জিয়াদের পরিবারের ঘরজামাই।

অভিযোগ রয়েছে, এর আগে মনিপুর বিট কর্তৃপক্ষ তাকে ওই স্থানে কোনো স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেয়নি। কিন্তু বর্তমানে অর্থের বিনিময়ে বিট কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান তাকে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

স্থানীয় সূত্রের আরও দাবি, বিট কর্মকর্তা মান্নানের পরামর্শেই দিনের বেলা নির্মাণকাজ না করে রাতভর বিপুলসংখ্যক শ্রমিক দিয়ে গোডাউনটির নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে বিটের ক্যাশিয়ার ও বনপ্রহরী মাসুমের বিরুদ্ধেও অর্থের বিনিময়ে নির্মাণকাজে সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে। গোডাউন নির্মাণে জোতের পাশাপাশি বনেরজমিও যুক্ত করেছেন রওশন,দাবি বিশেষ সূত্রের।

তবে এ অভিযোগের পাশাপাশি জমির সীমানা নির্ধারণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, একই দাগের জমির ডিমার্কেশনের জন্য বন বিভাগের কাছে আবেদন করা হলেও এখন পর্যন্ত সীমানা নির্ধারণ হয়নি। অথচ ডিমার্কেশন সম্পন্ন হওয়ার আগেই বনভূমি-সংলগ্ন বনের জমিসহ বিশাল স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে।

জমির বিবরণ অনুযায়ী—এসএ দাগ ৫৭৪ ও ৫৭৫; আরএস দাগ ১৬৭৯ ও ১৬৮৩। সরেজমিনে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট জমির দুই পাশেই ভাওয়াল গড়ের বনভূমি রয়েছে। ফলে সীমানা নির্ধারণ না করে স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ দিলে ভবিষ্যতে সরকারি বনভূমির অংশ স্থায়ীভাবে দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


সংরক্ষিত বনভূমির মাঝখানে চারতলা ভবন:


মনিপুর বিটের কাতলামারা এলাকার মন্দিরের বিপরীতে দক্ষিণ দিকে মনিপুরমুখী রাস্তার পাশে সংরক্ষিত বনভূমির মাঝখানে চারতলা ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। সরেজমিনে তা প্রত্যক্ষও করা গেছে।

কুমিল্লার সোহেল নামের এক ব্যক্তি জমিটির মালিকানা দাবি করে ভবন নির্মাণ করছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, ভবনটির দক্ষিণাংশের কিছু অংশ সংরক্ষিত বনভূমির মধ্যে চলে গেছে।

যথাযথ জরিপ ও ডিমার্কেশন ছাড়া নির্মাণকাজ চলতে থাকলে সরকারি বনভূমি স্থায়ীভাবে দখল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।


হোতাপাড়ায় ছয়তলা ফাউন্ডেশন:


হোতাপাড়া বাসস্ট্যান্ডের অটোস্ট্যান্ডের পশ্চিম পাশে বাক্কির বাড়ি সংলগ্নও একই ধরনের অভিযোগ। চারদিকে ভাওয়াল গড়ের বনভূমি থাকা সত্ত্বেও ডিমার্কেশন ছাড়াই জালাল উদ্দিন মাস্টার নামে এক ব্যক্তির ছয়তলা ফাউন্ডেশনের ওপর দুইতলা নির্মাণকাজ চলছে বলে সরেজমিনে দেখা গেছে। বাড়ি নির্মাণে জোতের পাশাপাশি বনের জমি যুক্ত করেছেন জালালউদ্দিন,দাবি এলাকাবাসীর।

এর আগে হোতাপাড়া থেকে মনিপুরগামী মূল রাস্তার উত্তর পাশে ভাওয়ালগড় কেটে বনের জমিতে রাস্তা নির্মাণ করেছেন জালাল উদ্দিন মাস্টার। রাস্তাটি তাঁর বাড়িতে যাওয়ার জন্য নির্মাণ করা হলেও সংশ্লিষ্ট বিট রহস্যময় কারণে বাধা প্রদান করেনি, আইনগত ব্যবস্থাও নেয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বনভূমির সীমানা নির্ধারণ না করেই নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তারা।


প্রায় ৮ কাঠা জমিতে বাউন্ডারি, ডিমার্কেশন নেই:


মনিপুরে প্রয়াত সবুর মাস্টারের বাড়ির বিপরীতে এবং কফি হাউজের পূর্ব পাশে কয়েকদিন আগে প্রায় আট কাঠা জমিতে বাউন্ডারি নির্মাণ প্রত্যক্ষ করেছেন এই প্রতিবেদক। বাউন্ডারির ভেতরে বন বিভাগের জমির অংশও ঢুকে গেছে।

এ ঘটনায় 'বনের দালাল' নামে খ্যাত ইদুম আলী নামে স্থানীয় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বনভূমি দখলে মধ্যস্থতা করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ইদুম আলীর মধ্যস্থতায় জনৈক কহিনুর বেগম বায়নাসূত্রে ওই জমি কিনেছেন।

জমির বিবরণ—পরিমাণ ১৩ দশমিক ১৩ শতাংশ; খতিয়ান: সিএস-১৩১, এসএ-৩৪২, আরএস-১৯০; দাগ: এসএ-৩১০, আরএস-১০৩৮।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, জমির সীমানা নির্ধারণ না করেই কীভাবে এত বড় বাউন্ডারি নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হলো?


২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম, সপ্তাহ পেরিয়েও বহাল বাড়ি:


বেগমপুর কাজী মার্কেটের পশ্চিম পাশে পল্লী চিকিৎসক ডা. খোরশেদ আলমের একটি সুবিশাল বাড়ি নির্মাণ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিন ও জমির নথির সূত্রে দেখা গেছে, বাড়িটি বন বিভাগের জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে।

বার্তা পেয়ে মনিপুর বিট কর্মকর্তা ও রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের কর্মকর্তারা বিটের সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের পর বাড়িটি ভেঙে ফেলার জন্য ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেওয়া হয় বলে স্থানীয়রা জানান।

কিন্তু এক সপ্তাহের বেশি সময় পার হলেও বাড়িটি আগের অবস্থাতেই রয়েছে। এরপর এ বিষয়ে বন বিভাগের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।


উচ্ছেদ হলো, আবারও উঠল ঘর:


মনিপুর বিটের নয়াপাড়ার আশ্রমচালা এলাকায় বনভূমি দখলের চিত্র আরও উদ্বেগজনক।

৫ আগস্টের পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযানে বেশ কিছু ঘর সরিয়ে দেওয়া হয়। সরেজমিনে দেখা গেছে, উচ্ছেদের পর গত দুই মাসে একই এলাকায় প্রায় ৮৬টি ঘর নতুন করে নির্মাণ অথবা পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রতিটি ঘর নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণের জন্য ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। এ হিসাবে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের একাংশের দাবি, সব মিলিয়ে প্রায় ৭০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে পরিচিত একটি বিশেষ চক্রের বিরুদ্ধে বনভূমিতে ঘর নির্মাণে মধ্যস্থতার অভিযোগ রয়েছে। তাদের সঙ্গে মনিপুর বিট কর্মকর্তা আব্দুল মান্নানের যোগসাজশের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।

আরও অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের উচ্ছেদ অভিযানের জন্য বিট কর্মকর্তা মান্নান সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা খরচ বাবদ গ্রহণ করেছিলেন।

একদিকে উচ্ছেদ অভিযান, অন্যদিকে অর্থের বিনিময়ে একই এলাকায় ফের ঘর নির্মাণের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

উচ্ছেদের পর ফের নির্মাণের অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে

স্থানীয়দের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, উচ্ছেদ অভিযানে ঘর সরিয়ে নেওয়ার পর পুনরায় ঘর নির্মাণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে—উজ্জল, শ্রী সুবল, মো. সাদ্দাম, শ্রী সত্যেন, বলাই চন্দ্র বর্মন, জিয়া, সত্যেন্দ্র, কিবরিয়া, তোফাজ্জল হোসেন মন্টে, মো. হেলাল ও আবু তালেব।

এ ছাড়া উচ্ছেদের সময় ঘর খুলে রাখার পর একই এলাকায় পুনরায় স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে মো. আসাদ মাঝি, মো. সুমন, মো. হামিদ, মো. গিয়াস উদ্দিন, মো. শেফালী রানী, মো. সাদেক, শ্রী গোবিন্দ দেবনাথ, রতন রাজশাহী, শ্রী নিরঞ্জন ও লিপির বিরুদ্ধে। এদের ঘরবাড়ি আশ্রমচালা এলাকায়।


বনভূমিতে ঘরবাড়ির দীর্ঘ তালিকা:


স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যে আশ্রমচালা এলাকায় আরও যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে বনভূমিতে ঘরবাড়ি নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে (এবং সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করা গেছে)  তারা হলেন—হারুন, আল আমিন, শুকুর আলী, বিল্লাল (তালা মেকার), মিজান, নজরুল, ইসলাম উদ্দিন, মনির, ফখরুদ্দিন, রুবেল, রাজশাহী জহির, জহির, নিত্য, লিটন রাজশাহী, অর্জুন, সমরঞ্জন, বোঝ, মর্জিনা, সুজন বংশী, আনন্দ, রঞ্জিত বংশী, রিপন বংশী, নিতাই, ফাতেমা, বিল্লাল, হানিফা, সাগর রাজশাহী, সুবল চন্দ্র বর্মন, নবী হোসেন, হযরত, যতীন বংশী, রিয়াজ, সুলতান, শরিফ, ফরিদ, মারফতের স্ত্রী, মহি, আব্দুর রহিম, নিতাই বংশী, স্বপন, রবীন্দ্র, সবিতা, চৈতি, লুৎফর বেপারী, ফরহাদ, ফওসিউল, রিয়াজুল, আব্দুল আউয়াল, খুশি, গৌরাঙ্গ, ইউনুস, লায়লা, ববিতা, রোকেয়া, হামিদ, ইসমাইল, গিয়াস উদ্দিন, শেফালী রানী, ফরিদ, জামির হোসেন, আশিক ও তাইজুল ইসলাম।


স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ঘর নির্মাণ-পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে ঘরপ্রতি ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। এসব টাকা স্থানীয় চিহ্নিত দালাল ও বিট কর্মকর্তা মান্নান এবং বিট ক্যাশিয়ার মাসুমের পকেটে গেছে বলে সূত্রের দাবি।


আইন কী বলছে:


বনভূমি নিয়ে এমন অভিযোগের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় বিদ্যমান আইনি কাঠামোর কারণে। বন আইন, ১৯২৭-এর ২৬ ধারায় সংরক্ষিত বনে অনুমতি ছাড়া ভূমি পরিষ্কার, চাষাবাদ বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে জমি ব্যবহারসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে শাস্তিযোগ্য করা হয়েছে। একই আইনের ২৩ ধারায় লিখিত সরকারি অনুমোদন ছাড়া সংরক্ষিত বনে কোনো নতুন অধিকার অর্জনের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।

বন কর্মকর্তাকে প্রয়োজনে জমি জরিপ, ডিমার্কেশন ও মানচিত্র তৈরির ক্ষমতাও আইনে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বনভূমির সীমানা নিয়ে বিরোধ বা অনিশ্চয়তা থাকলে যথাযথ জরিপ ও সীমানা নির্ধারণের গুরুত্ব রয়েছে। নিয়ন্ত্রিত বনভূমির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ডিমার্কেশনের বিধানও আইনে রয়েছে।


বনভূমি কমলে শুধু গাছ নয়, বিপন্ন হয় পুরো প্রতিবেশ:


পরিবেশবিদদের মতে, বনভূমির প্রান্তে একের পর এক বসতি, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও পাকা ভবন গড়ে উঠলে ক্ষতি শুধু জমির পরিমাণ কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বনভূমির খণ্ডীকরণে বন্যপ্রাণীর চলাচল ও আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মানুষের প্রবেশ বাড়ে এবং ভবিষ্যতে আরও দখলের পথ তৈরি হয়।

ভাওয়াল গড়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চলের ক্ষেত্রে তাই কোনো জমির মালিকানা বা দখল নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কাগজপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি দাগ, খতিয়ান, মৌজা ম্যাপ, আরএস/এসএ রেকর্ড এবং বন বিভাগের নিজস্ব সীমানা—সবকিছু মিলিয়ে যৌথ জরিপ করা জরুরি বলে মনে করছেন পরিবেশসংশ্লিষ্টরা।




কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:


অভিযোগের বিষয়ে সদ্য বিদায়ী মনিপুর বিট কর্মকর্তা ও ডেপুটি রেঞ্জার আব্দুল মান্নানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোনকল গ্রহণ করেননি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা সাইফুল বারী বলেন, ‘এতদিন বিট কর্মকর্তা বিটে ছিলেন, তখন আপনারা কেন কিছু জানাননি? এখন বদলি হয়ে যাওয়ার পর কেন বলছেন?’

অনুসন্ধান চলাকালে কোনো কর্মকর্তা বদলি হয়ে গেলে তাঁর বিরুদ্ধে আগের অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান বা ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না—এমন কোনো সরকারি বিধান আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উনি থাকাকালীন অভিযোগগুলো করলে ভালো হতো, তাই বললাম।’

তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারপরও যদি এ ধরনের কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


এদিকে অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. বশিরুল আল মামুনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি ফোনকল গ্রহণ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।


একই বিষয়ে ঢাকা বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক মোহাম্মদ শামসুল আরেফীনের সঙ্গেও একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য পাঠিয়ে তাঁর বক্তব্যও জানতে চাওয়া হয়। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তিনিও কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।


ভিশন বাংলা ২৪

Advisory Editor: Syed Shajahan Saju, Adviser: Advocate Shajan Majumder, Chief Editor: Tuhin Bhuiyan, Executive Editor: S.M. Kamal, Managing Editor: Bayzid Bostami, Asst. Editor: Sahara Moon, Asst. Editor: Azgar Ali
কপিরাইট © ২০২৬ ভিশন বাংলা ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত