শিক্ষাব্যবস্থায় অকৃতকার্য ও ঝরে পড়া বিপুল তরুণকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাবনা
দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া ও ঝরে পড়া তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী রূপরেখা বিবেচনা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিত প্রস্তাবনা জানানো হয়েছে। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের শমশেরনগরের বাসিন্দা এবং বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. সায়েক আহমদ গত ২০ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই প্রস্তাবনা জমা দেন। লিখিত প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়, সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী ও তরুণের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ ২ হাজার ৪৫৭ জন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০.০২ শতাংশ। দেশের এই এক-পঞ্চমাংশ তরুণ জনসংখ্যাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সুবিধা অর্জনের বড় হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বিশাল এই সম্ভাবনাময় অংশ বর্তমানে সঠিক নির্দেশনার অভাবে উপযুক্ত কাজে আসতে পারছে না।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যের বরাতে আবেদনটিতে জানানো হয়, প্রাথমিক শিক্ষা স্তরেই ঝরে পড়ার হার ১৬.২৫ শতাংশ, যা মাধ্যমিকে গিয়ে পৌঁছায় প্রায় ৩২.৮৫ শতাংশে। এমনকি উচ্চ মাধ্যমিক স্তরেও ভর্তি ও নিবন্ধনের পর প্রায় ৪৪.৫৪ শতাংশ শিক্ষার্থী চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছে না। প্রচলিত তত্ত্বনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে কিংবা মাঝপথে ঝরে পড়ার কারণে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ছে। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কর্মসংস্থান না পেয়ে এই তরুণরা বেকারত্ব বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে দেশে আনুষ্ঠানিক বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ ৮২ হাজার হলেও শিক্ষাদান, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে (এনইইটি) এমন নিষ্ক্রিয় তরুণের সংখ্যা প্রায় ১ কোটির কাছাকাছি।
এই বাস্তবতায় পরীক্ষায় দুর্বল কিন্তু বাস্তবে কর্মঠ ও সম্ভাবনাময় এসব তরুণকে দক্ষ জনসম্পদে পরিণত করতে দেশের প্রতিটি স্কুল-কলেজে কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা অবিলম্বে চালু করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত দূরদর্শী রূপরেখায় শিক্ষার্থীদের শ্রেণী ও বয়সের ওপর ভিত্তি করে তিন মাস, ছয় মাস, এক বছর, দুই বছর, তিন বছর, পাঁচ বছর এবং দশ বছর মেয়াদী বিশেষায়িত কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার সুপারিশ করা হয়। সেই সাথে প্রশিক্ষণ শেষে সরকারিভাবে তাদের সরাসরি কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি, প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের জামানতবিহীন সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ সুবিধা প্রদান এবং তৃণমূল পর্যায়ের প্রথাগত পেশাগুলোকে (যেমন: মুদি দোকানদার, কৃষিকর্মী, চা দোকানদার) আধুনিকায়নে প্রশিক্ষণ প্রদানের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ঝরে পড়া দক্ষ জনশক্তিকে আন্তর্জাতিক চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে সরকারি উদ্যোগে বিদেশে পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা ও রেমিট্যান্স অর্জনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা এবং বর্তমান ভূ-রাজনীতি ও ভৌগোলিক সুরক্ষার জন্য আধুনিক অস্ত্র ও ডিফেন্স টেকনোলজিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী বাহিনী গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়।
প্রস্তাবনাটিতে দেশের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে পাঠ্যক্রমে ৯ শতাধিক প্রায়োগিক ও কর্মমুখী বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে বিশেষায়িত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আহ্বান জানানো হয়। অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষক চিঠিতে উল্লেখ করেন যে, সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে অকৃতকার্য বা পিছিয়ে পড়া কোটি কোটি তরুণ দেশের জন্য বোঝা না হয়ে সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত হতে পারে। অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি স্বনির্ভর, শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও সামরিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করাতে এই রূপরেখা পর্যবেক্ষণপূর্বক তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।