ঢাকা    শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভিশন বাংলা ২৪

অভিযোগের কেন্দ্রে পরিষদ সভাপতি

বারিধারা ডিওএইচএসে প্রাণী নিয়ে বিরোধ থেকে বাসিন্দাদের ওপর হামলা


শাহীন মোড়ল
শাহীন মোড়ল ​বিশেষ প্রতিনিধি

বারিধারা ডিওএইচএসে প্রাণী নিয়ে বিরোধ থেকে বাসিন্দাদের ওপর হামলা

রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএসে বেওয়ারিশ কুকুর ও বিড়ালকে কেন্দ্র করে একের পর এক বিতর্কিত ঘটনার পর এবার সাধারণ বাসিন্দাদের ওপর নিরাপত্তারক্ষীদের হামলার অভিযোগ উঠেছে। প্রাণী সরিয়ে নেওয়া, কুকুর নিখোঁজ হওয়া, সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া এবং সর্বশেষ বিড়ালকে খাবার দিতে গিয়ে চার বাসিন্দা আহত হওয়ার ঘটনায় এলাকাটিতে ব্যাপক ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগী ও প্রাণীপ্রেমীদের অভিযোগ, এসব ঘটনার নেপথ্যে রয়েছেন বারিধারা ডিওএইচএস পরিষদের বর্তমান সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল এম আব্দুল হাই। যদিও তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সর্বশেষ ঘটনায় গত ২৭ আগস্ট দিবাগত রাতে বারিধারা ডিওএইচএস পার্কের নিকটবর্তী এলাকায় বেওয়ারিশ বিড়ালকে খাবার দিতে গিয়ে পরিষদের নিরাপত্তারক্ষীদের হামলার শিকার হন অন্তত চারজন বাসিন্দা। আহতদের মধ্যে একজন নারীও রয়েছেন। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে দেখা যায়, প্রাণীদের খাবার দেওয়াকে কেন্দ্র করে কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীদের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে পরিষদের প্রায় ২০ জন নিরাপত্তারক্ষী তাদের ওপর চড়াও হন।

ভুক্তভোগী আকিবুর রহমান খান জানান, ঘটনার রাতে তিনি তার স্ত্রী নীলিমা নদী এবং আরও কয়েকজন বাসিন্দাকে নিয়ে পার্ক এলাকার বেওয়ারিশ বিড়ালদের খাবার দিতে যান। তাদের দাবি, তারা কোনো নিষিদ্ধ কাজ করছিলেন না এবং ডিওএইচএস পরিষদের নিয়ম ভঙ্গ না করে রাস্তার নির্দিষ্ট একটি লেনে প্রাণীদের খাবার দিচ্ছিলেন। কিন্তু নিরাপত্তারক্ষীরা এসে তাদের বাধা দেন। ঘটনার ভিডিও ধারণের চেষ্টা করা হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

আকিবুর রহমানের অভিযোগ, নিরাপত্তারক্ষীরা তার স্ত্রীকে লাঞ্ছিত করেন এবং তাকে মাটিতে ফেলে মারধর করেন। তার মুখ ও পিঠে লাথি মারা হয় বলেও তিনি দাবি করেন। বুট দিয়ে পা মাড়িয়ে দেওয়ার কারণে তার পায়ের একটি আঙুল ফ্র্যাকচার হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। অন্য আহতরাও নিরাপত্তারক্ষীদের বিরুদ্ধে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ তুলেছেন।

ঘটনার সময় ভুক্তভোগীদের কয়েকটি ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনও নিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আকিবুর রহমান জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ও মিলিটারি পুলিশ ঘটনাস্থলে এলেও তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল ফোনগুলো ফেরত দেওয়া হয়নি। নিরাপত্তারক্ষীরা পরিষদের সভাপতির অনুমতি ছাড়া ফোন ফেরত দেওয়া যাবে না বলে জানিয়েছিল বলে তার দাবি। পরে পরদিন বিকেলে ফোনগুলো ফেরত দেওয়া হয়।

এই ঘটনার প্রতিবাদে আজ ভুক্তভোগী, স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রাণীপ্রেমীরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ এবং সাধারণ বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান। তাদের অভিযোগ, ঘটনার পর পরিষদ একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানালেও এখন পর্যন্ত তদন্তের অগ্রগতি বা ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।

মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীদের ভাষ্য, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং গত কয়েক মাস ধরে বারিধারা ডিওএইচএসে মুক্তভাবে বিচরণকারী প্রাণীদের নিয়ে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, সর্বশেষ হামলার ঘটনা তারই ধারাবাহিকতা। তাদের দাবি, এলাকায় প্রাণীদের প্রতি বিরূপ মনোভাব থেকে এক ধরনের সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং যারা প্রাণীদের খাবার দেওয়া বা তাদের অধিকার নিয়ে কথা বলছেন, তাদেরও বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

এর আগে গত ২ আগস্ট বারিধারা ডিওএইচএস এলাকা থেকে অন্তত ১২টি কুকুর নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় প্রাণীপ্রেমী ও বাসিন্দাদের অভিযোগ ছিল, কুকুরগুলোকে পরিকল্পিতভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে অথবা হত্যা করা হয়েছে। সে সময় ডিওএইচএস পরিষদের পক্ষ থেকে কুকুরগুলো ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নিয়ে গেছে বলে দাবি করা হয়। তবে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন লিখিতভাবে জানায়, তারা বারিধারা ডিওএইচএস থেকে কোনো বেওয়ারিশ কুকুর অপসারণ করেনি। একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় এবং বিষয়টি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়।

১২টি কুকুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার তদন্ত এখনো চলমান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। ভুক্তভোগী ও প্রাণীপ্রেমীদের দাবি, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কুকুরগুলোর ভাগ্যে কী ঘটেছে তা প্রকাশ করা জরুরি। তাদের অভিযোগ, কুকুর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে পরিষদের দেওয়া বক্তব্য এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের লিখিত অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট অসঙ্গতি রয়েছে।

কুকুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি সামনে আনার পর সাংবাদিক ইকবাল খন্দকারকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি একটি জাতীয় দৈনিকে এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের জন্য তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বারিধারা ডিওএইচএস পরিষদের সভাপতি কর্নেল (অব.) এম আব্দুল হাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, কুকুরগুলো ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নিয়ে গেছে। কিন্তু সাংবাদিকের কাছে তখন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত এমন একটি চিঠি ছিল, যেখানে সংস্থাটি কুকুর অপসারণের অভিযোগ অস্বীকার করে।

ইকবাল খন্দকারের অভিযোগ, এ বিষয়ে প্রশ্ন করার পর পরিষদ সভাপতি তার ওপর ক্ষুব্ধ হন এবং ফোনালাপ শেষ করে দেন। কয়েকদিন পর তিনি একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা পান, যেখানে তার ব্যক্তিগত অবস্থান ও বাসার তথ্যসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য উল্লেখ করা ছিল। ওই বার্তায় ‘রেকর্ডেড বাই ক্যান্টনমেন্ট পুলিশ স্টেশন’ লেখা ছিল বলে তিনি দাবি করেন। বিষয়টি যাচাই করতে তিনি ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে পুলিশ তার তথ্য রেকর্ড করার বিষয়টি অস্বীকার করে বলে সাংবাদিকের দাবি।

নিজের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং পুলিশের নাম ব্যবহার করে বার্তা পাঠানোর ঘটনাকে হুমকি হিসেবে দেখছেন ইকবাল খন্দকার। এ ঘটনায় তিনি ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডি নম্বর ৩৭৭। তার অভিযোগ, প্রাণী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ এবং পরিষদের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণেই তাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইকবাল খন্দকারের একাধিক পোস্টে বারিধারা ডিওএইচএস পরিষদের সভাপতি এম আব্দুল হাইয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হয়। সেখানে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, বাসিন্দাদের ওপর নির্যাতন এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ করা হয়। তবে এসব অভিযোগের বেশির ভাগই এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সাংবাদিক নিজেও তার একটি পোস্টে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য অন্য সাংবাদিকদের অনুসন্ধানের আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে অভিযোগগুলোকে এই মুহূর্তে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তবে প্রাণীসংক্রান্ত সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে পরিষদ সভাপতির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, ২৭ আগস্টের হামলার ঘটনায় নিরাপত্তারক্ষীরা নিজের সিদ্ধান্তে নয়, বরং পরিষদের উচ্চপর্যায়ের ইঙ্গিতেই এতটা আক্রমণাত্মক আচরণ করেছে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।

ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, হামলার ঘটনা যদি স্বচ্ছভাবে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ এখনো প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন। তাদের দাবি, ফুটেজ প্রকাশ করা হলে হামলার শুরু, কারা হামলায় অংশ নিয়েছে এবং ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হতো।

প্রাণী কল্যাণ আইন, ২০১৯ অনুযায়ী, মুক্তভাবে বিচরণকারী প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ, ক্ষতি করা বা আইনবহির্ভূতভাবে অপসারণের বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। প্রাণী অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, বারিধারা ডিওএইচএসে বেওয়ারিশ কুকুর ও বিড়ালকে ঘিরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু প্রাণী কল্যাণের প্রশ্ন নয়; বরং সাধারণ বাসিন্দাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নও সামনে এনেছে।

ঘটনার পর প্রাণীপ্রেমী সংগঠন ‘পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার’ এবং ‘এভরিথিং ফর অ্যানিমেলস’ হামলার নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, একটি আবাসিক এলাকায় বেওয়ারিশ প্রাণীকে খাবার দেওয়ার মতো ঘটনাকে কেন্দ্র করে কীভাবে নারীসহ সাধারণ বাসিন্দাদের ওপর শারীরিক হামলার পরিস্থিতি তৈরি হলো।

এ বিষয়ে বারিধারা ডিওএইচএস পরিষদের সভাপতি কর্নেল (অব.) এম আব্দুল হাইয়ের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি বলে ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকরা জানিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সম্পর্কে সরাসরি বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হতো।

অন্যদিকে ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ জানিয়েছে, তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছে এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, শুধু অভিযোগ গ্রহণ নয়, ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

বারিধারা ডিওএইচএসে ১২টি কুকুর নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ, সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার দাবি এবং সর্বশেষ বিড়ালকে খাবার দিতে গিয়ে বাসিন্দাদের ওপর হামলার ঘটনা—সব মিলিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে, একটি আবাসিক এলাকায় প্রাণীদের প্রতি আচরণকে কেন্দ্র করে কেন এতটা সংঘাত তৈরি হলো। আরও বড় প্রশ্ন, এসব ঘটনার পেছনে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা কিংবা দায়িত্ব আছে কি না।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগী ও প্রাণীপ্রেমীদের দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ এবং হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে। তাদের ভাষ্য, এটি শুধু কয়েকটি কুকুর বা বিড়ালের প্রশ্ন নয়; বরং একটি আবাসিক এলাকায় সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত—সেই প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে।

ভিশন বাংলা ২৪

শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬


বারিধারা ডিওএইচএসে প্রাণী নিয়ে বিরোধ থেকে বাসিন্দাদের ওপর হামলা

প্রকাশের তারিখ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএসে বেওয়ারিশ কুকুর ও বিড়ালকে কেন্দ্র করে একের পর এক বিতর্কিত ঘটনার পর এবার সাধারণ বাসিন্দাদের ওপর নিরাপত্তারক্ষীদের হামলার অভিযোগ উঠেছে। প্রাণী সরিয়ে নেওয়া, কুকুর নিখোঁজ হওয়া, সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া এবং সর্বশেষ বিড়ালকে খাবার দিতে গিয়ে চার বাসিন্দা আহত হওয়ার ঘটনায় এলাকাটিতে ব্যাপক ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগী ও প্রাণীপ্রেমীদের অভিযোগ, এসব ঘটনার নেপথ্যে রয়েছেন বারিধারা ডিওএইচএস পরিষদের বর্তমান সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল এম আব্দুল হাই। যদিও তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


সর্বশেষ ঘটনায় গত ২৭ আগস্ট দিবাগত রাতে বারিধারা ডিওএইচএস পার্কের নিকটবর্তী এলাকায় বেওয়ারিশ বিড়ালকে খাবার দিতে গিয়ে পরিষদের নিরাপত্তারক্ষীদের হামলার শিকার হন অন্তত চারজন বাসিন্দা। আহতদের মধ্যে একজন নারীও রয়েছেন। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে দেখা যায়, প্রাণীদের খাবার দেওয়াকে কেন্দ্র করে কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীদের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে পরিষদের প্রায় ২০ জন নিরাপত্তারক্ষী তাদের ওপর চড়াও হন।


ভুক্তভোগী আকিবুর রহমান খান জানান, ঘটনার রাতে তিনি তার স্ত্রী নীলিমা নদী এবং আরও কয়েকজন বাসিন্দাকে নিয়ে পার্ক এলাকার বেওয়ারিশ বিড়ালদের খাবার দিতে যান। তাদের দাবি, তারা কোনো নিষিদ্ধ কাজ করছিলেন না এবং ডিওএইচএস পরিষদের নিয়ম ভঙ্গ না করে রাস্তার নির্দিষ্ট একটি লেনে প্রাণীদের খাবার দিচ্ছিলেন। কিন্তু নিরাপত্তারক্ষীরা এসে তাদের বাধা দেন। ঘটনার ভিডিও ধারণের চেষ্টা করা হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।


আকিবুর রহমানের অভিযোগ, নিরাপত্তারক্ষীরা তার স্ত্রীকে লাঞ্ছিত করেন এবং তাকে মাটিতে ফেলে মারধর করেন। তার মুখ ও পিঠে লাথি মারা হয় বলেও তিনি দাবি করেন। বুট দিয়ে পা মাড়িয়ে দেওয়ার কারণে তার পায়ের একটি আঙুল ফ্র্যাকচার হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। অন্য আহতরাও নিরাপত্তারক্ষীদের বিরুদ্ধে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ তুলেছেন।


ঘটনার সময় ভুক্তভোগীদের কয়েকটি ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনও নিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আকিবুর রহমান জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ও মিলিটারি পুলিশ ঘটনাস্থলে এলেও তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল ফোনগুলো ফেরত দেওয়া হয়নি। নিরাপত্তারক্ষীরা পরিষদের সভাপতির অনুমতি ছাড়া ফোন ফেরত দেওয়া যাবে না বলে জানিয়েছিল বলে তার দাবি। পরে পরদিন বিকেলে ফোনগুলো ফেরত দেওয়া হয়।


এই ঘটনার প্রতিবাদে আজ ভুক্তভোগী, স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রাণীপ্রেমীরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ এবং সাধারণ বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান। তাদের অভিযোগ, ঘটনার পর পরিষদ একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানালেও এখন পর্যন্ত তদন্তের অগ্রগতি বা ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।


মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীদের ভাষ্য, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং গত কয়েক মাস ধরে বারিধারা ডিওএইচএসে মুক্তভাবে বিচরণকারী প্রাণীদের নিয়ে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, সর্বশেষ হামলার ঘটনা তারই ধারাবাহিকতা। তাদের দাবি, এলাকায় প্রাণীদের প্রতি বিরূপ মনোভাব থেকে এক ধরনের সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং যারা প্রাণীদের খাবার দেওয়া বা তাদের অধিকার নিয়ে কথা বলছেন, তাদেরও বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।


এর আগে গত ২ আগস্ট বারিধারা ডিওএইচএস এলাকা থেকে অন্তত ১২টি কুকুর নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় প্রাণীপ্রেমী ও বাসিন্দাদের অভিযোগ ছিল, কুকুরগুলোকে পরিকল্পিতভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে অথবা হত্যা করা হয়েছে। সে সময় ডিওএইচএস পরিষদের পক্ষ থেকে কুকুরগুলো ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নিয়ে গেছে বলে দাবি করা হয়। তবে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন লিখিতভাবে জানায়, তারা বারিধারা ডিওএইচএস থেকে কোনো বেওয়ারিশ কুকুর অপসারণ করেনি। একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় এবং বিষয়টি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়।


১২টি কুকুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার তদন্ত এখনো চলমান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। ভুক্তভোগী ও প্রাণীপ্রেমীদের দাবি, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কুকুরগুলোর ভাগ্যে কী ঘটেছে তা প্রকাশ করা জরুরি। তাদের অভিযোগ, কুকুর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে পরিষদের দেওয়া বক্তব্য এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের লিখিত অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট অসঙ্গতি রয়েছে।


কুকুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি সামনে আনার পর সাংবাদিক ইকবাল খন্দকারকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি একটি জাতীয় দৈনিকে এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের জন্য তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বারিধারা ডিওএইচএস পরিষদের সভাপতি কর্নেল (অব.) এম আব্দুল হাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, কুকুরগুলো ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নিয়ে গেছে। কিন্তু সাংবাদিকের কাছে তখন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত এমন একটি চিঠি ছিল, যেখানে সংস্থাটি কুকুর অপসারণের অভিযোগ অস্বীকার করে।


ইকবাল খন্দকারের অভিযোগ, এ বিষয়ে প্রশ্ন করার পর পরিষদ সভাপতি তার ওপর ক্ষুব্ধ হন এবং ফোনালাপ শেষ করে দেন। কয়েকদিন পর তিনি একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা পান, যেখানে তার ব্যক্তিগত অবস্থান ও বাসার তথ্যসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য উল্লেখ করা ছিল। ওই বার্তায় ‘রেকর্ডেড বাই ক্যান্টনমেন্ট পুলিশ স্টেশন’ লেখা ছিল বলে তিনি দাবি করেন। বিষয়টি যাচাই করতে তিনি ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে পুলিশ তার তথ্য রেকর্ড করার বিষয়টি অস্বীকার করে বলে সাংবাদিকের দাবি।


নিজের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং পুলিশের নাম ব্যবহার করে বার্তা পাঠানোর ঘটনাকে হুমকি হিসেবে দেখছেন ইকবাল খন্দকার। এ ঘটনায় তিনি ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডি নম্বর ৩৭৭। তার অভিযোগ, প্রাণী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ এবং পরিষদের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণেই তাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।


এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইকবাল খন্দকারের একাধিক পোস্টে বারিধারা ডিওএইচএস পরিষদের সভাপতি এম আব্দুল হাইয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হয়। সেখানে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, বাসিন্দাদের ওপর নির্যাতন এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ করা হয়। তবে এসব অভিযোগের বেশির ভাগই এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সাংবাদিক নিজেও তার একটি পোস্টে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য অন্য সাংবাদিকদের অনুসন্ধানের আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে অভিযোগগুলোকে এই মুহূর্তে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।


তবে প্রাণীসংক্রান্ত সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে পরিষদ সভাপতির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, ২৭ আগস্টের হামলার ঘটনায় নিরাপত্তারক্ষীরা নিজের সিদ্ধান্তে নয়, বরং পরিষদের উচ্চপর্যায়ের ইঙ্গিতেই এতটা আক্রমণাত্মক আচরণ করেছে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।


ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, হামলার ঘটনা যদি স্বচ্ছভাবে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ এখনো প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন। তাদের দাবি, ফুটেজ প্রকাশ করা হলে হামলার শুরু, কারা হামলায় অংশ নিয়েছে এবং ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হতো।


প্রাণী কল্যাণ আইন, ২০১৯ অনুযায়ী, মুক্তভাবে বিচরণকারী প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ, ক্ষতি করা বা আইনবহির্ভূতভাবে অপসারণের বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। প্রাণী অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, বারিধারা ডিওএইচএসে বেওয়ারিশ কুকুর ও বিড়ালকে ঘিরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু প্রাণী কল্যাণের প্রশ্ন নয়; বরং সাধারণ বাসিন্দাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নও সামনে এনেছে।


ঘটনার পর প্রাণীপ্রেমী সংগঠন ‘পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার’ এবং ‘এভরিথিং ফর অ্যানিমেলস’ হামলার নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, একটি আবাসিক এলাকায় বেওয়ারিশ প্রাণীকে খাবার দেওয়ার মতো ঘটনাকে কেন্দ্র করে কীভাবে নারীসহ সাধারণ বাসিন্দাদের ওপর শারীরিক হামলার পরিস্থিতি তৈরি হলো।


এ বিষয়ে বারিধারা ডিওএইচএস পরিষদের সভাপতি কর্নেল (অব.) এম আব্দুল হাইয়ের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি বলে ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকরা জানিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সম্পর্কে সরাসরি বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হতো।


অন্যদিকে ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ জানিয়েছে, তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছে এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, শুধু অভিযোগ গ্রহণ নয়, ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।


বারিধারা ডিওএইচএসে ১২টি কুকুর নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ, সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার দাবি এবং সর্বশেষ বিড়ালকে খাবার দিতে গিয়ে বাসিন্দাদের ওপর হামলার ঘটনা—সব মিলিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে, একটি আবাসিক এলাকায় প্রাণীদের প্রতি আচরণকে কেন্দ্র করে কেন এতটা সংঘাত তৈরি হলো। আরও বড় প্রশ্ন, এসব ঘটনার পেছনে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা কিংবা দায়িত্ব আছে কি না।


মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগী ও প্রাণীপ্রেমীদের দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ এবং হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে। তাদের ভাষ্য, এটি শুধু কয়েকটি কুকুর বা বিড়ালের প্রশ্ন নয়; বরং একটি আবাসিক এলাকায় সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত—সেই প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে।


ভিশন বাংলা ২৪

Advisory Editor: Syed Shajahan Saju, Adviser: Advocate Shajan Majumder, Chief Editor: Tuhin Bhuiyan, Executive Editor: S.M. Kamal, Managing Editor: Bayzid Bostami, Asst. Editor: Sahara Moon, Asst. Editor: Azgar Ali
কপিরাইট © ২০২৬ ভিশন বাংলা ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত