ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
ভিশন বাংলা ২৪

আইডিআরএ চেয়ারম্যান

বীমা কোম্পানির দেওয়া তথ্যই সঠিক নয়


ডেস্ক রিপোর্ট
ডেস্ক রিপোর্ট

বীমা কোম্পানির দেওয়া তথ্যই সঠিক নয়

বীমা কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে (আইডিআরএ) যে তথ্য দেয়, তা সব সময় প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না। একাধিক বা গোপন সার্ভার ব্যবহারের কারণে কোম্পানির ব্যবসা ও আর্থিক অবস্থার পূর্ণাঙ্গ তথ্যও নিয়ন্ত্রকের হাতে থাকে না বলে জানিয়েছেন আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন।

তিনি বলেন, ২০২৬ সালে বসে ২০২৫ সালের অডিট প্রতিবেদন পাওয়া গেলেও তা দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি কার্যকরভাবে তদারকি করা কঠিন। এর ওপর কোম্পানিগুলো যে তথ্য দিচ্ছে, সেটিই যদি সঠিক না হয়, তাহলে দেড় বছর আগের তথ্য দেখে বর্তমান ঝুঁকি শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।

শুক্রবার ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) আয়োজিত এক আবাসিক কর্মশালায় এসব কথা বলেন মীর নাদিয়া নিভিন। বীমা খাতের তথ্যের স্বচ্ছতা, ডিজিটাল রূপান্তর, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, গ্রাহকের দাবি পরিশোধ এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় নিয়ে বক্তব্য দেন তিনি।

আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, শুধু আর্থিক প্রতিবেদন দেখে বীমা খাতের প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। কোম্পানিগুলোকে প্রকৃত তথ্য দিতে হবে। একই সঙ্গে আইডিআরএকে তথ্য সরবরাহের বিষয়ে আরও শক্তিশালী বিধান করতে হবে।

কোম্পানিগুলোর একাধিক বা গোপন সার্ভার ব্যবহারের অভিযোগ তুলে মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, জীবনবীমা ও সাধারণ বীমা—দুই খাতের কোম্পানির ক্ষেত্রেই এ ধরনের তথ্য ব্যবস্থাপনার বিষয় সামনে এসেছে। এর ফলে কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে যে তথ্য দেয়, তার সঙ্গে প্রকৃত ব্যবসার তথ্যের মিল আছে কি না, তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ কারণে যেসব কোম্পানির একাধিক বা গোপন সার্ভার রয়েছে, সেগুলো শনাক্ত করে একীভূত করতে ছয় সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) ও বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, নির্দেশনা না মানলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোথায় সার্ভার লুকানো হয়েছে, তা শনাক্ত করতে প্রযুক্তিগত নিরীক্ষা করা আইডিআরের জন্য কঠিন নয়। প্রয়োজনে গ্যারেজ, বিছানার নিচে বা দেশের অন্য যেকোনো জায়গা থেকেও সার্ভার শনাক্ত করা হবে।

বীমা কোম্পানিগুলোর দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভরতা কমাতে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি বা রিস্ক বেজড সুপারভিশন (আরবিএস) চালুর কথা জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো বীমা খাতে এ ব্যবস্থা চালু করা হবে। এর মাধ্যমে কোন কোম্পানি কী ধরনের তথ্য দিচ্ছে, কোথায় তথ্যের ঘাটতি রয়েছে এবং কোন প্রতিষ্ঠানে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রথম হিসেবে আইডিআরএ এ ধরনের ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে।

বীমা খাতের তথ্য ব্যবস্থাপনা আরও স্বচ্ছ করতে পুরো খাতের জন্য একটি অভিন্ন ‘ইউনিক পলিসি আইডি’ চালুর কথাও জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, ব্যাংক হিসাব নম্বরের মতো পুরো বীমা খাতের জন্য একটি ইউনিক পলিসি আইডি চালু করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রতিটি কোম্পানির নিজস্ব পলিসি নম্বর রয়েছে। আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে পুরো খাতে এ ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আইডিআরের দলগুলো বিভিন্ন কোম্পানিতে গিয়ে আরবিএস ব্যবস্থা স্থাপন, প্রশিক্ষণ এবং ইউনিক পলিসি আইডি চালুর কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

মীর নাদিয়া নিভিনের মতে, এ ব্যবস্থা চালু হলে ভুয়া প্রিমিয়াম দেখানো, ব্যবসার তথ্য আংশিকভাবে প্রকাশ করা কিংবা একই ব্যবসার তথ্য গোপন করার সুযোগ কমবে।

বীমা কোম্পানিগুলোর তথ্য গোপনের সুযোগ বন্ধ করতে অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে ব্যাংক হিসাব শনাক্তকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের সঙ্গেও বৈঠক হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে যৌথ অডিটের পরিকল্পনা চলছে।

বর্তমানে কোনো কোম্পানির তথ্য যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আলাদাভাবে চিঠি দেওয়া ও জবাবের জন্য অপেক্ষা করতে হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। এতে কোনো একটি সংস্থার চেয়ারম্যান বা কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় অব্যাহত থাকবে।

Space for ads

নন-লাইফ বীমা খাতে এলসি ব্যবস্থায়ও ডিজিটাল নজরদারি চালুর পরিকল্পনার কথা জানান মীর নাদিয়া নিভিন।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আইডিআরএ থেকে দেওয়া ইউনিক কভার নোট আইডি ছাড়া কোনো ব্যাংক এলসি খুলতে পারবে না। এলসি খোলার আগে বাংলাদেশ ব্যাংক আইডিআরের সিস্টেম থেকে কভার নোট যাচাই করবে।

এর ফলে প্রতিটি এলসির বিপরীতে সংশ্লিষ্ট বীমা ব্যবসার তথ্য আইডিআরের কাছে থাকবে। এতে ব্যবসার প্রকৃত পরিমাণ গোপন করার সুযোগ কমবে।

বকেয়া দাবি পরিশোধে সংকটে থাকা কয়েকটি বীমা কোম্পানির সম্পদ বিক্রি ও অন্যান্য সম্পদ নগদায়ন করে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম আগামী সপ্তাহ থেকে শুরু হবে বলে জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, প্রথম ধাপে সাত-আটটি কোম্পানিকে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এসব কোম্পানির জমি, ট্রেজারি বন্ড, এফডিআরসহ বিভিন্ন সম্পদ নগদায়নের মাধ্যমে পাওয়া অর্থ আইডিআরের তদারকিতে পৃথক ব্যাংক হিসাবে রাখা হয়েছে। সেখান থেকে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ করা হবে।

দাবি পরিশোধে ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট’ (এফআইএফও) পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। অর্থাৎ যে গ্রাহকের দাবি আগে এসেছে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাঁর দাবি আগে পরিশোধ করা হবে।

কোম্পানিগুলোর ব্যাংক হিসাবে আইডিআরের তদারকি ও নিরীক্ষকের উপস্থিতি থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, কোম্পানিগুলোর সরাসরি ওই অর্থ ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না। গ্রাহকদের দাবির তালিকাও নিরীক্ষকদের দিয়ে যাচাই করা হয়েছে।

বকেয়া দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের কথা উল্লেখ করে মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার দাবি পরিশোধ না করার বিষয় রয়েছে। এ কারণে কোম্পানিটির নতুন প্রথমবর্ষের প্রিমিয়াম নেওয়া বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে নবায়ন প্রিমিয়াম নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তিনি জানান, ফারইস্টের ফেনীতে থাকা একটি জমি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ এবং কিছু বন্ড নগদায়নের অর্থ গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে ব্যবহার করা হবে। প্রাথমিকভাবে কয়েক শ কোটি টাকা দিয়ে পরিশোধ কার্যক্রম শুরু হতে পারে। আরও কয়েকটি সম্পত্তি বিক্রির জন্য দরপত্র দেওয়া হচ্ছে।

ফারইস্টের সব সম্পদ ও বন্ড নগদায়ন করা হলে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাওয়া যেতে পারে বলে জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান। ওই অর্থ দিয়ে বড় একটি অংশের দাবি নিষ্পত্তির পর কোম্পানিটির ব্যবসার ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে।

আইডিআরের জনবল সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরেন মীর নাদিয়া নিভিন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যেখানে প্রায় ৭ হাজার কর্মী দিয়ে ব্যাংকিং খাত নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে আইডিআরএকে প্রায় ১৫০ জন জনবল দিয়ে ৮২টি বীমা কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে।

আইডিআরের আইনগত দুর্বলতাও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, ২০১০ সালের বীমা আইন বর্তমান আর্থিক খাতের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সময়ের সঙ্গে আইন হালনাগাদ ও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

বীমা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অংশীদারের মতো কাজ করতে চান জানিয়ে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, নিয়ন্ত্রক হিসেবে কোম্পানিগুলোকে আইডিআরের নির্দেশনা মানতে হবে।

কোনো কোম্পানি নিয়ন্ত্রকের নির্দেশনা না মানলে তাদের জন্য ব্যবসা করা কঠিন করে দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি। সামনে আইডিআরএকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেখা যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, তার মূল দায়িত্ব পলিসিহোল্ডারদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষা করা। বীমা খাতকে শক্তিশালী আর্থিক খাতে পরিণত করতে হলে প্রথমে তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।

গণমাধ্যমের উদ্দেশে তিনি বলেন, বীমা খাতের প্রকৃত তথ্য তুলে ধরতে সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণের পাশাপাশি সেগুলো প্রকৃত তথ্য কি না, সেই প্রশ্নও করতে হবে। জনগণের কাছ থেকে পাওয়া বাস্তব চিত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে তুলে ধরলে সংস্কার কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইআরএফ সভাপতি গোলাম মাওলা। বিশেষ অতিথি ছিলেন ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. কাজিম উদ্দিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আইআরএফ সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন।

ভিশন বাংলা ২৪

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


বীমা কোম্পানির দেওয়া তথ্যই সঠিক নয়

প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬

featured Image

বীমা কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে (আইডিআরএ) যে তথ্য দেয়, তা সব সময় প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না। একাধিক বা গোপন সার্ভার ব্যবহারের কারণে কোম্পানির ব্যবসা ও আর্থিক অবস্থার পূর্ণাঙ্গ তথ্যও নিয়ন্ত্রকের হাতে থাকে না বলে জানিয়েছেন আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন।


তিনি বলেন, ২০২৬ সালে বসে ২০২৫ সালের অডিট প্রতিবেদন পাওয়া গেলেও তা দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি কার্যকরভাবে তদারকি করা কঠিন। এর ওপর কোম্পানিগুলো যে তথ্য দিচ্ছে, সেটিই যদি সঠিক না হয়, তাহলে দেড় বছর আগের তথ্য দেখে বর্তমান ঝুঁকি শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।


শুক্রবার ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) আয়োজিত এক আবাসিক কর্মশালায় এসব কথা বলেন মীর নাদিয়া নিভিন। বীমা খাতের তথ্যের স্বচ্ছতা, ডিজিটাল রূপান্তর, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, গ্রাহকের দাবি পরিশোধ এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় নিয়ে বক্তব্য দেন তিনি।


আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, শুধু আর্থিক প্রতিবেদন দেখে বীমা খাতের প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। কোম্পানিগুলোকে প্রকৃত তথ্য দিতে হবে। একই সঙ্গে আইডিআরএকে তথ্য সরবরাহের বিষয়ে আরও শক্তিশালী বিধান করতে হবে।


কোম্পানিগুলোর একাধিক বা গোপন সার্ভার ব্যবহারের অভিযোগ তুলে মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, জীবনবীমা ও সাধারণ বীমা—দুই খাতের কোম্পানির ক্ষেত্রেই এ ধরনের তথ্য ব্যবস্থাপনার বিষয় সামনে এসেছে। এর ফলে কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে যে তথ্য দেয়, তার সঙ্গে প্রকৃত ব্যবসার তথ্যের মিল আছে কি না, তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।


এ কারণে যেসব কোম্পানির একাধিক বা গোপন সার্ভার রয়েছে, সেগুলো শনাক্ত করে একীভূত করতে ছয় সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) ও বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।


মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, নির্দেশনা না মানলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোথায় সার্ভার লুকানো হয়েছে, তা শনাক্ত করতে প্রযুক্তিগত নিরীক্ষা করা আইডিআরের জন্য কঠিন নয়। প্রয়োজনে গ্যারেজ, বিছানার নিচে বা দেশের অন্য যেকোনো জায়গা থেকেও সার্ভার শনাক্ত করা হবে।


বীমা কোম্পানিগুলোর দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভরতা কমাতে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি বা রিস্ক বেজড সুপারভিশন (আরবিএস) চালুর কথা জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।


তিনি বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো বীমা খাতে এ ব্যবস্থা চালু করা হবে। এর মাধ্যমে কোন কোম্পানি কী ধরনের তথ্য দিচ্ছে, কোথায় তথ্যের ঘাটতি রয়েছে এবং কোন প্রতিষ্ঠানে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।


মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রথম হিসেবে আইডিআরএ এ ধরনের ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে।


বীমা খাতের তথ্য ব্যবস্থাপনা আরও স্বচ্ছ করতে পুরো খাতের জন্য একটি অভিন্ন ‘ইউনিক পলিসি আইডি’ চালুর কথাও জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।


তিনি বলেন, ব্যাংক হিসাব নম্বরের মতো পুরো বীমা খাতের জন্য একটি ইউনিক পলিসি আইডি চালু করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রতিটি কোম্পানির নিজস্ব পলিসি নম্বর রয়েছে। আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে পুরো খাতে এ ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


আইডিআরের দলগুলো বিভিন্ন কোম্পানিতে গিয়ে আরবিএস ব্যবস্থা স্থাপন, প্রশিক্ষণ এবং ইউনিক পলিসি আইডি চালুর কাজ করছে বলেও জানান তিনি।


মীর নাদিয়া নিভিনের মতে, এ ব্যবস্থা চালু হলে ভুয়া প্রিমিয়াম দেখানো, ব্যবসার তথ্য আংশিকভাবে প্রকাশ করা কিংবা একই ব্যবসার তথ্য গোপন করার সুযোগ কমবে।


বীমা কোম্পানিগুলোর তথ্য গোপনের সুযোগ বন্ধ করতে অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।


তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে ব্যাংক হিসাব শনাক্তকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের সঙ্গেও বৈঠক হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে যৌথ অডিটের পরিকল্পনা চলছে।


বর্তমানে কোনো কোম্পানির তথ্য যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আলাদাভাবে চিঠি দেওয়া ও জবাবের জন্য অপেক্ষা করতে হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। এতে কোনো একটি সংস্থার চেয়ারম্যান বা কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় অব্যাহত থাকবে।


Space for ads

নন-লাইফ বীমা খাতে এলসি ব্যবস্থায়ও ডিজিটাল নজরদারি চালুর পরিকল্পনার কথা জানান মীর নাদিয়া নিভিন।


তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আইডিআরএ থেকে দেওয়া ইউনিক কভার নোট আইডি ছাড়া কোনো ব্যাংক এলসি খুলতে পারবে না। এলসি খোলার আগে বাংলাদেশ ব্যাংক আইডিআরের সিস্টেম থেকে কভার নোট যাচাই করবে।


এর ফলে প্রতিটি এলসির বিপরীতে সংশ্লিষ্ট বীমা ব্যবসার তথ্য আইডিআরের কাছে থাকবে। এতে ব্যবসার প্রকৃত পরিমাণ গোপন করার সুযোগ কমবে।


বকেয়া দাবি পরিশোধে সংকটে থাকা কয়েকটি বীমা কোম্পানির সম্পদ বিক্রি ও অন্যান্য সম্পদ নগদায়ন করে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম আগামী সপ্তাহ থেকে শুরু হবে বলে জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।


তিনি বলেন, প্রথম ধাপে সাত-আটটি কোম্পানিকে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এসব কোম্পানির জমি, ট্রেজারি বন্ড, এফডিআরসহ বিভিন্ন সম্পদ নগদায়নের মাধ্যমে পাওয়া অর্থ আইডিআরের তদারকিতে পৃথক ব্যাংক হিসাবে রাখা হয়েছে। সেখান থেকে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ করা হবে।


দাবি পরিশোধে ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট’ (এফআইএফও) পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। অর্থাৎ যে গ্রাহকের দাবি আগে এসেছে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাঁর দাবি আগে পরিশোধ করা হবে।


কোম্পানিগুলোর ব্যাংক হিসাবে আইডিআরের তদারকি ও নিরীক্ষকের উপস্থিতি থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, কোম্পানিগুলোর সরাসরি ওই অর্থ ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না। গ্রাহকদের দাবির তালিকাও নিরীক্ষকদের দিয়ে যাচাই করা হয়েছে।


বকেয়া দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের কথা উল্লেখ করে মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার দাবি পরিশোধ না করার বিষয় রয়েছে। এ কারণে কোম্পানিটির নতুন প্রথমবর্ষের প্রিমিয়াম নেওয়া বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে নবায়ন প্রিমিয়াম নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।


তিনি জানান, ফারইস্টের ফেনীতে থাকা একটি জমি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ এবং কিছু বন্ড নগদায়নের অর্থ গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে ব্যবহার করা হবে। প্রাথমিকভাবে কয়েক শ কোটি টাকা দিয়ে পরিশোধ কার্যক্রম শুরু হতে পারে। আরও কয়েকটি সম্পত্তি বিক্রির জন্য দরপত্র দেওয়া হচ্ছে।


ফারইস্টের সব সম্পদ ও বন্ড নগদায়ন করা হলে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাওয়া যেতে পারে বলে জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান। ওই অর্থ দিয়ে বড় একটি অংশের দাবি নিষ্পত্তির পর কোম্পানিটির ব্যবসার ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে।


আইডিআরের জনবল সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরেন মীর নাদিয়া নিভিন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যেখানে প্রায় ৭ হাজার কর্মী দিয়ে ব্যাংকিং খাত নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে আইডিআরএকে প্রায় ১৫০ জন জনবল দিয়ে ৮২টি বীমা কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে।


আইডিআরের আইনগত দুর্বলতাও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, ২০১০ সালের বীমা আইন বর্তমান আর্থিক খাতের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সময়ের সঙ্গে আইন হালনাগাদ ও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।


বীমা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অংশীদারের মতো কাজ করতে চান জানিয়ে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, নিয়ন্ত্রক হিসেবে কোম্পানিগুলোকে আইডিআরের নির্দেশনা মানতে হবে।


কোনো কোম্পানি নিয়ন্ত্রকের নির্দেশনা না মানলে তাদের জন্য ব্যবসা করা কঠিন করে দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি। সামনে আইডিআরএকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেখা যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।


মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, তার মূল দায়িত্ব পলিসিহোল্ডারদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষা করা। বীমা খাতকে শক্তিশালী আর্থিক খাতে পরিণত করতে হলে প্রথমে তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।


গণমাধ্যমের উদ্দেশে তিনি বলেন, বীমা খাতের প্রকৃত তথ্য তুলে ধরতে সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণের পাশাপাশি সেগুলো প্রকৃত তথ্য কি না, সেই প্রশ্নও করতে হবে। জনগণের কাছ থেকে পাওয়া বাস্তব চিত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে তুলে ধরলে সংস্কার কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।


অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইআরএফ সভাপতি গোলাম মাওলা। বিশেষ অতিথি ছিলেন ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. কাজিম উদ্দিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আইআরএফ সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন।


ভিশন বাংলা ২৪

Advisory Editor: Syed Shajahan Saju, Adviser: Advocate Shajan Majumder, Chief Editor: Tuhin Bhuiyan, Executive Editor: S.M. Kamal, Managing Editor: Bayzid Bostami, Asst. Editor: Sahara Moon, Asst. Editor: Azgar Ali
কপিরাইট © ২০২৬ ভিশন বাংলা ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত