হাজারীবাগের মাদক সাম্রাজ্যের নেপথ্যের সম্রাট রাজেশ ও নিখিল
রাজধানীর হাজারীবাগ ও আশপাশের এলাকায় একটি কথিত মাদক নেটওয়ার্ক নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দেয়া রাজেশ গনি ও নিখিল ওরফে সোহেল ওই এলাকার মাদক ব্যবসার একটি অংশ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত।
ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজা ব্যবসার পাশাপাশি পুলিশ, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও স্থানীয় অপরাধী চক্রের সঙ্গে তাদের কথিত যোগাযোগ নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। এলাকাটির সঙ্গে পরিচিত কয়েকটি সূত্রের দাবি, রাজেশের সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা নিক্সন চৌধুরী ও সাবেক এমপি হাজী সেলিমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।
বিএনপি সাজার জন্য সাম্প্রতিক সময়ে রাজেশ বিএনপি নেতা ও সাবেক ঢাকা কলেজ ভিপি আলী নেওয়াজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছেন। সূত্রের অভিযোগ, এলাকায় নিজের প্রভাব বাড়াতে এবং কথিত মাদক ব্যবসা পরিচালনায় রাজেশ আলী নেওয়াজের নাম ব্যবহার করছেন।
পুলিশের ‘সোর্স’ নিখিল?
একাধিক সূত্রের দাবি, নিখিল ওরফে সোহেল হাজারীবাগ এলাকায় পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করেছেন। জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নিখিল আওয়ামী লীগের হয়ে সক্রিয় ছিলেন এবং সেখানে ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রসমাজের মিছিলে হামলায় যুক্ত ছিলেন। ৫ অগাস্টেফ পরে নিখিল গা ঢাকা দেয়, পরে রাজেশের সহোযগিতায় আবার পুলিশের কথিত সোর্স হিসেবে কাজ শুরু করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ,
পুলিশের সঙ্গে এ ধরনের যোগাযোগকে ব্যবহার করে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা কোনো কোনো ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর থেকে আড়াল করার চেষ্টা করে নিখিল।
সূত্রগুলোর দাবি, রাজেশ ও নিখিল কথিত মাদক ব্যবসায় কে থাকবে এবং কে গ্রেপ্তার হবে—এমন বিষয়েও প্রভাব বিস্তার করেন। নিখিলের পুলিশের সোর্স হিসেবে কথিত ভূমিকা এবং মাদক নেটওয়ার্কের বিষয়ে হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হাজারিবাগের অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায় শাহজাহান আলী, স্বপন ও কালা মানিককে রাজেশ ও নিখিলের হয়ে এই এলেকায় মাদকের সাম্রাজ্য গরে তুলেছে। এই নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি হাজারীবাগ, নবাবগঞ্জ বাজার ও সেকশন ঢালসহ আশপাশের এলাকায় রয়েছে। এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা ও অভিভাবক মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
‘ডন সাগর’-এর সঙ্গে যোগাযোগ
রাজেশ-নিখিল নেটওয়ার্কের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে ‘ডন সাগর’ নামে পরিচিত এক কিশোর গ্যাং সদস্যের যোগাযোগের অভিযোগও রয়েছে। সাগরের এক স্বজনের দাবি, ছেলেটি একসময় সাধারণ শিক্ষার্থী ছিল। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। ওই স্বজনের অভিযোগ, রাজেশ ও নিখিল তাকে মাদক ব্যবসায় ব্যবহার করেন। তবে ইয়াবা ও গাঁজা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে তাদের সম্পর্কের অবনতি হয় বলে দাবি করেন তিনি। ওই স্বজনের অভিযোগ, বিরোধের জেরে রাজেশ ও নিখিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথিত যোগাযোগ ব্যবহার করে সাগরকে গ্রেপ্তার করান।
হাজারীবাগ-লালবাগে পাঁচ ফ্ল্যাট?
সূত্রগুলোর আরও দাবি, লালবাগ ও হাজারীবাগ এলাকায় রাজেশের অন্তত পাঁচটি ফ্ল্যাট রয়েছে।তাদের ভাষ্য, এসব সম্পত্তি ও স্থানীয় যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি এলাকায় নিজের প্রভাব ধরে রেখেছেন।
নিক্সন চৌধুরীর সঙ্গে কথিত ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে রাজেশ ইত্তেফাক-এর সঙ্গেও যোগাযোগ তৈরি করেছেন বলে সূত্রগুলো দাবি করেছে। ইত্তেফাকের বর্তমান মালিক নিক্সন চৌধুরীর স্ত্রী।
রাজেশ ও নিখিলকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো তাই একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কথিত মাদক নেটওয়ার্ক গুলো কীভাবে টিকে থাকে এবং রাজনৈতিক কিংবা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগকে কি অপরাধ মূলক কর্মকাণ্ডে সুরক্ষা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে?
হাজারীবাগ, নবাবগঞ্জ বাজার ও সেকশন ঢালের বাসিন্দা ও অভিভাবকদের অনেকে কথিত মাদক নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তারা ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজার কথিত ব্যবসার পাশাপাশি রাজনৈতিক যোগাযোগ, পুলিশের সোর্স ব্যবস্থার অপব্যবহার এবং অপরাধীদের কথিত সুরক্ষার অভিযোগও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।