বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ১২:৩০ অপরাহ্ন
ডেস্ক নিউজ:
নীলফামারীর সদরের লক্ষীচাপ (কচুয়া) ১০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের নতুন ভবনের নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির সরেজমিন পরিদর্শনের পর চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ভবনটির নিম্নমানের নির্মাণকাজের কারণে সাধারণ জনগণের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
তদন্তে নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ
তদন্ত কমিটি যখন ভবনের বিভিন্ন অংশ পরিদর্শন করেন, তখন নতুন কিছু ভয়াবহ অনিয়ম ধরা পড়ে। যা পূর্বের অভিযোগগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।
১. দেয়ালে ফাটল: নির্মাণ শেষের আগেই বিপদজনক অবস্থা!
তদন্ত কমিটির সদস্যরা দেখেছেন, ভবনের বেশ কিছু অংশে দেয়ালে ফাটল ধরেছে। নতুন ভবনের ক্ষেত্রে এটি অস্বাভাবিক। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, নিম্নমানের সিমেন্ট ও বালু ব্যবহার করার কারণেই দেয়ালগুলো এত দ্রুত দুর্বল হয়ে গেছে। একজন প্রকৌশলী জানান, যদি এটি এখনই সংস্কার করা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
২. দরজা ও জানালার সমস্যা: নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার
তদন্তে উঠে এসেছে, ভবনের দরজা ও জানালাগুলো এতটাই নিম্নমানের যে, কয়েকটি জায়গায় তা ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। কাঠের দরজাগুলো পাতলা ও দুর্বল, আর জানালার থাই গ্লাস এতটাই স্বচ্ছ যে হাসপাতালের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গার জন্য তা একেবারেই অনুপযুক্ত।
৩. থাই গ্লাস: গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগ
হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল জায়গায় থাই গ্লাস ব্যবহার করা হলেও তা এতটাই নিম্নমানের যে, বাইরে থেকে ভেতরের দৃশ্য সহজেই দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে প্রসূতি মায়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এটি বড় ধরনের গাফিলতি বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
৪. পানির পাম্পের সমস্যা: অপচয়ের আরেকটি নজির
তদন্ত কমিটির সদস্যরা পানির পাম্প পরীক্ষা করে দেখেন যে, এটি স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে না। এলাকাবাসীর অভিযোগ, নিম্নমানের পাম্প বসানো হয়েছে, যা কিছুদিনের মধ্যেই বিকল হয়ে যাবে। অথচ এই ধরনের স্থাপনায় দীর্ঘস্থায়ী ও মানসম্মত পানির পাম্প ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।
৫. লাইট ও বৈদ্যুতিক সংযোগের ত্রুটি
তদন্ত দল দেখতে পান, হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষে লাইটের ব্যবস্থা থাকলেও তা সঠিকভাবে কাজ করছে না। অনেক সুইচ কাজ করে না, বৈদ্যুতিক তারগুলো ঝুলে আছে এবং কোথাও কোথাও খোলা অবস্থায় রয়েছে, যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
৬. ফ্যানের নিম্নমান
হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষে লাগানো ফ্যানগুলো চালু করতেই বিকট শব্দ হচ্ছে। অনেক ফ্যান ঘোরে না, আর কিছু ফ্যান চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এটি স্পষ্ট যে, নিম্নমানের ফ্যান ব্যবহার করা হয়েছে, যা কিছুদিন পর নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া: ক্ষোভে ফুঁসছে সাধারণ মানুষ
তদন্তের এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর সাধারণ জনগণের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি হাসপাতালে অনিয়ম হলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? এলাকাবাসী আরও আশঙ্কা করছেন, এই দুর্বল কাঠামোতে হাসপাতালের কার্যক্রম চালু করা হলে ভবিষ্যতে রোগীদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, “সরকার কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও দুর্নীতিবাজ ঠিকাদারেরা নিম্নমানের কাজ করছে। আমরা চাই দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক!”
তদন্ত কমিটির মন্তব্য ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
তদন্ত কমিটির প্রধান বলেন, “আমরা ঘটনাস্থলে এসে নিশ্চিত হয়েছি যে, নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। এসব অনিয়মের বিষয়টি উচ্চপর্যায়ে জানানো হবে এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোজাম্মেল হক জানান, “তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে। যদি দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সাধারণ মানুষের দাবি: অপরাধীদের কঠোর শাস্তি
স্থানীয় সচেতন জনগণের দাবি, ভবনের নির্মাণের প্রতিটি অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত এবং এর সঙ্গে জড়িত দুর্নীতিবাজদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এছাড়া, ভবন ব্যবহারের আগে যেন পুনরায় গুণগত মান পরীক্ষা করা হয়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি টাকার অপচয় রোধে এবং জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই হাসপাতাল ভবন ভবিষ্যতে মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এখন দেখার বিষয়, তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর কত দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।