সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক সংস্কারে প্রায় ৬ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ
কাজ নেই, তবু বিলের খাতা ভারী—‘সিন্ডিকেট-পাঠানার’ যোগসাজশের অভিযোগ, কর্মকর্তা বদলি নিয়েও প্রশ্ন !
সড়কে সংস্কারের দৃশ্য নেই, মাঠে নেই কাঙ্ক্ষিত কাজের চিহ্ন—তবু কাগজপত্রে যেন কাজ শেষ। কোথাও মাটির কাজ হয়নি, কোথাও বেস টাইপ-১, প্রাইম কোট কিংবা ওয়্যারিং কোর্সের কাজ দৃশ্যমান নয়। অথচ প্রকল্পের হিসাব, পরিমাপ ও বিল-ভাউচারে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে সরকারি অর্থ ছাড়ের অভিযোগ উঠেছে।এ ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের ২৩ থেকে ৪৬ কিলোমিটার অংশের সংস্কার প্রকল্প ঘিরে এমন
অভিযোগ নিয়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ছয় কোটি টাকার সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
তবে অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা এবং সরকারি অর্থের কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না—তা নিশ্চিত করতে প্রকল্পের মূল নথি, পরিমাপ বই, বিল-ভাউচার, ল্যাব রিপোর্ট ও মাঠপর্যায়ের কাজ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
কাগজে কাজ, মাঠে নেই—অভিযোগ জানা গেছে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে সড়ক শক্তিশালীকরণ ও মেরামতের জন্য ‘মেসার্স সালেহ অ্যান্ড ব্রাদার্স’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২ হাজার ৫৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের চারটি নির্দিষ্ট চেইনেজে মাটির কাজ, বেস টাইপ-১, প্রাইম কোট, ওয়্যারিং কোর্সসহ বিভিন্ন সংস্কার কাজ করার কথা ছিল। তা তিনি করেনি।
অভিযোগ অনুযায়ী, গোবিন্দগঞ্জ-ছাতক সড়কের তকিপুর এবং সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের জাউয়াবাজার, লক্ষ্মনসোম , খারাই ও জানধরটুপিসহ কয়েকটি এলাকায় কাজ দেখানো হয়েছে। কিন্তু এসব কাজের উল্লেখযোগ্য অংশ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বাস্তবে কাজের অগ্রগতি ও প্রকল্পের কাগজপত্রের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। মাঠপর্যায়ে কাজের পরিমাণ, পরিমাপ ও বিল প্রস্তুতের বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
সেতু নিয়েও প্রশ্ন প্রকল্পের ৪৩ কিলোমিটার অংশে প্রায় ২৮ মিটার দীর্ঘ একটি সেতুকে ঘিরেও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের মোট কাজের হিসাব করার সময় সেতুর অংশ যথাযথভাবে সমন্বয় করা হয়নি। এতে বাস্তবে সম্পন্ন না হওয়া অথবা প্রকল্পের আওতাবহির্ভূত কাজের বিপরীতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সংশ্লিষ্ট চুক্তিপত্র, প্রাক্কলন, ডিজাইন, চেইনেজভিত্তিক পরিমাপ ও বিল যাচাই করা জরুরি।
মান নিয়ন্ত্রণ নিয়েও অভিযোগ সংস্কারকাজের গুণগত মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট মানের বিটুমিনাস মিশ্রণ তৈরিতে প্রয়োজনীয় ব্যাচিং প্ল্যান্ট ব্যবহারের কথা থাকলেও অভিযোগকারীদের দাবি, সেখানে নিম্নমানের ড্রাম মিক্স ও হট মিক্স প্ল্যান্ট ব্যবহার করে কাজ করা হয়েছে।
আরও অভিযোগ করা হয়েছে, বিষয়টি যাচাই করতে ল্যাব টিম সাইটে মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা করতে গেলে তাদের পরীক্ষা সম্পন্ন করতে দেওয়া হয়নি।
অভিযোগটি সত্য হলে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ; কারণ সড়কের স্থায়িত্ব ও জননিরাপত্তার সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীর মান এবং যথাযথ ল্যাব পরীক্ষার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
কর্মকর্তা বদলি ঘিরে প্রশ্ন!
অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমানের বদলির বিষয়টি। অভিযোগকারীদের মতে, প্রকল্পের অনিয়ম ও অসম্পূর্ণ কাজের বিল নিয়ে আপত্তি জানানোর পর অল্প সময়ের ব্যবধানে তাকে সিলেট থেকে দিনাজপুর সওজ সার্কেল অফিসে বদলি করা হয়।
সংশ্লিষ্ট নথির বরাত দিয়ে অভিযোগকারীরা জানান, ২০২৬ সালের ১৯ মে এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি হয়। পরবর্তী সময়ে দায়িত্ব হস্তান্তর ও বদলি-সংক্রান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েও নানা প্রশ্ন ওঠে।
তাদের অভিযোগ, অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসার পর কর্মকর্তাকে বদলি করা এবং একই সময়ে বিল-সংক্রান্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ঘটনাগুলো পরস্পর সম্পর্কিত কি না—তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
তবে কোনো কর্মকর্তার বদলিকে অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত করার আগে বদলির সরকারি কারণ ও প্রশাসনিক নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
‘সিন্ডিকেটের’ অভিযোগ অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় ছিল। মাঠপর্যায়ের কাজ, পরিমাপ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিল অনুমোদনের বিভিন্ন পর্যায়ে ওই চক্র প্রভাব বিস্তার করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের তীর সওজের সিলেট জোন, সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগ, ছাতক সড়ক উপবিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দিকে। তবে ‘সিন্ডিকেট’ বা যোগসাজশের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও লেনদেনের স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
কর্মকর্তাদের বক্তব্যঃ সিলেট সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) আবু সাইদ মো. নাজমুল হুদার সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ আহাদ উল্ল্যাহর সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনিও ফোন রিসিভ করেননি।
তবে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান অভিযোগের বিষয়ে বলেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে তাকে রাতারাতি সিলেট থেকে দিনাজপুরে বদলি করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তার ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তিনি আপত্তি জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে ছাতক সড়ক উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. শাহদাৎ হোসেন মোবাইল ফোনে বলেন, “সংস্কার কাজ কোথায় হচ্ছে, তা আমি জানি না।”
তার এই বক্তব্যের পর প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের তদারকি ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তের দাবিঃ অভিযোগকারীদের দাবি, পুরো প্রকল্পটি স্বাধীন কারিগরি ও আর্থিক তদন্তের আওতায় আনা হোক। বিশেষ করে কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র, প্রাক্কলন, চেইনেজভিত্তিক পরিমাপ বই, বিল-ভাউচার, ল্যাব রিপোর্ট, প্ল্যান্ট ব্যবহারের নথি, সাইট পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং অর্থ ছাড়ের কাগজপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে অভিযোগের আওতাভুক্ত প্রতিটি স্থানে পুনঃপরিমাপ করে প্রকৃত কাজের পরিমাণ নির্ধারণের দাবি উঠেছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সরকারি অর্থ উদ্ধারের পাশাপাশি দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কটি প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন ব্যবহার করে। ফলে সংস্কারকাজে অনিয়ম হলে তার প্রভাব শুধু সরকারি অর্থের ওপর নয়, সড়কের স্থায়িত্ব ও জননিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত উত্থাপিত অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত হয়নি। তাই নিরপেক্ষ তদন্ত, নথিপত্র যাচাই এবং মাঠপর্যায়ে পুনঃপরিমাপের মাধ্যমেই প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হওয়া সম্ভব হবে।