ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
ভিশন বাংলা ২৪

ঈশ্বরদীর সংবাদপত্র জগৎ


ফজলুল হক রোকন
ফজলুল হক রোকন অতিথি লেখক

ঈশ্বরদীর সংবাদপত্র জগৎ

বাংলাদেশের একটি প্রসিদ্ধ উপজেলা ঈশ্বরদী। ব্রিটিশ ভারত আমলেই ঈশ্বরদী ছিল ভারতবর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান, ভারতের পশ্চিম অঞ্চলের সাথে উত্তর পূর্ব অঞ্চলের যোগাযোগের এক সুবিধাজনক স্থান ছিল ঈশ্বরদী। সে আমলে পদ্মা নদীর কুষ্টিয়া পাড়ে রাইটা ঘাট এবং পাবনা পাড়ের সাঁড়া স্টিমার ঘাটের অবস্থানের কারণে এবং আজ থেকে শতবর্ষের অধিক সময় পূর্বে হাড্রিঞ্জ ব্রিজ নির্মিত হওয়ায় ঈশ্বরদীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রেলওয়ে জংশন, যার ফলে এক সময় ঈশ্বরদীকে বলা হতো উত্তরবঙ্গের প্রবেশ দ্বার, সেই খ্যাতি আজও আছে। শতবর্ষ আগেই ঈশ্বরদীর পাকশীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়, পরবর্তীতে পাকশীতেই হয়েছিল রেলওয়ের বিভাগীয় কার্যালয়, যা এখনও চলমান। পাকিস্তান আমলে ঈশ্বরদী বিমান বন্দর ও পাকশীতে স্থাপিত হয় দেশের একটি ভারী শিল্প কারখানা “উত্তরবঙ্গ কাগজ কল”। আজ ঈশ্বরদীর রূপপুর গ্রামে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও ঈশ্বরদী ইপিজেড এ অঞ্চলের গুরুত্বকে বাড়িয়েছে আরও বহুগুণ। ঈশ্বরদীতেই  ্আছে দেশের একমাত্র ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র, আছে ডাল গবেষণা কেন্দ্র, আরও আছে অনেকগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এসব কারণেই পাকশী এবং ঈশ্বরদীতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসে উচ্চ শিক্ষিত মানুষসহ নানা পেশার মানুষ। রেলওয়ের চাকরিসূত্রে ব্রিটিশ আমলে পাকশীতে বসবাস ছিল ভারতের নানা প্রদেশের মানুষের, পাকশীতে থাকতেন ইংরেজ সাহেবরাও। এসমস্ত কারণে পাকশী ঈশ্বরদীতে গড়ে উঠেছিল উন্নত সাংস্কৃতিক জগৎ। অত্র এলাকার মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয়েছিল প্রগতিশীল চিন্তা চেতনা। তখন থেকেই এ অঞ্চলের প্রগতিশীল মানুষের মাঝে সংবাদপত্রের প্রতি এক আলাদা ঝোঁক সৃষ্টি হয়, তারই ধারাবাহিককতায় আজকের ঈশ্বরদী সংবাদপত্র জগৎ। পাকিস্তান আমল থেকেই ঈশ্বরদীর বুকে তৈরি হয়েছে অনেক অনেক নিবেদিতপ্রাণ প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকের, যাদের মধ্যে আছেন মরহুম আব্দুর রাজ্জাক, গোলাম কিবরিয়া, মরহুম লতিফ বিশ্বাস, মরহুম অ্যাড.মঞ্জুর হোসেন বকুল, মরহুম মহসিন রিয়াজি, জনাব কামাল আহমেদসহ অনেকে। আরও কয়েকজন শ্রদ্ধাভাজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ঈশ্বরদীতে সাংবাদিক হিসাবে কাজ করেছেন, তাঁরা হলেন কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল, সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন আহমেদ, বিশিষ্ট রাজনীতিবীদ ন্যাপের হালিম চৌধুরী। এসব শ্রদ্ধাভাজন সাংবাদিকদের উত্তরসূরি হিসাবে ঈশ্বরদীর বুকে অনেক প্রতিভাবান সাংবাদিক আজ জাতীয় পত্রিকার স্থানীয় প্রতিনিধি ও স্থানীয় পত্রিকায় কাজ করছেন। যারা এই মফস্বল শহরে সাংবাদিক হিসাবে কাজ করছেন তাদের বেশিরভাগই এটাকে পেশা হিসাবে নেননি, নিয়েছেন নেশা হিসাবে। যারা সংবাদপত্রের সাথে জড়িত আছেন তাদের বেশিরভাগই মনে করেন একটি পত্রিকার সাথে জড়িত থেকে তারা সাংস্কৃতিক জগতের সাথে জড়িত আছেন, জড়িত আছেন শিল্প-সাহিত্য জগতের সাথে। যতদূর জানা যায় বর্তমান সময়ে ঈশ্বরদী থেকে নিয়মিত ও অনিয়মিতভাবে বিশ থেকে একুশটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়, দু’একটি দৈনিক পত্রিকাও প্রকাশিত হয়। একটি মফস্বল শহর থেকে এতগুলো পত্রিকা প্রকাশিত হওয়া সত্যিই এক বিরল ঘটনা বলেই আমার মনে হয়। ঈশ্বরদী থেকে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি পত্রিকার নাম এখানে দেওয়া হলো।

ঈশ্বরদী থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলার বেশকিছু নাম:

সাপ্তাহিক জংশন, সাপ্তাহিক জনদাবী, সাপ্তাহিক বিজয়দীপ্ত, সাপ্তাহিক সংবাদ সাতদিন, সাপ্তাহিক ঈশ্বরদী, প্রথম সকাল, সময়ের ইতিহাস, ঈশ্বরদী বার্তা, পদ্মার খবর, হ্যালো ঈশ্বরদী, চেতনায় ঈশ্বরদী, সাপ্তাহিক সমকোণ, সাপ্তাহিক ঈশ্বরদীর কাগজ, সাপ্তাহিক ঈশ্বরদীর আলো, সাপ্তাহিক জয়পত্র সহ আরও কিছু পত্রিকা নিয়মিত ও অনিয়মিতভাবে প্রকাশ হচ্ছে। ঈশ্বরদী থেকে প্রকাশিত দু তিনটি দৈনিক পত্রিকার কথা জানা যায়। দৈনিক পত্রিকার মধ্যে আছে— দৈনিক বীর বাংলা, দৈনিক উন্নয়নের কথা ও আরো কয়েকটি দৈনিক নিয়মিত-অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। এই লেখাতে সবগুলো পত্রিকার কথা তুলে ধরা সম্ভব না। 

ঈশ্বরদীতে পত্রিকা প্রকাশের ইতিহাস:

ঈশ্বরদীর পত্রিকা প্রকাশের ইতিহাস আজ থেকে চার দশক আগের, গত শতাব্দীর আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। ঈশ্বরদীর সন্তান আতাউর রহমান লেখাপড়া করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগে, ১৯৮৩ সালে লেখাপড়া শেষ করেন, মাথায় চাপে পত্রিকার প্রকাশের নেশা। যতদূর জানি ঈশ্বরদীর বুকে প্রথম একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার ডিক্লারেশন নেন আতাউর রহমান— পত্রিকাটির নাম সাপ্তাহিক জংশন। পত্রিকাটির নামের সাথে ঈশ্বরদীর পরিচিতিও প্রকাশ পায়, ঈশ্বরদী রেলওয়ের জংশন হিসাবে খ্যাত, সম্ভবত একারণেই তিনি পত্রিকার নাম দিয়েছিলেন সাপ্তাহিক জংশন। অল্প সময়ের মধ্যেই পত্রিকাটি ঈশ্বরদীর মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। সেই সময় পত্রিকার সাথে জড়িয়ে পড়ে ঈশ্বরদী-পাকশীর অনেক তরুণ যুবক। অনেকেরই সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয় সাপ্তাহিক জংশনের মাধ্যমে। আতাউর রহমান অল্প কিছুদিন পত্রিকাটি সম্পাদক হিসাবে চালাতে পারেন, কারণ হঠাৎই তাকে চলে যেতে হয় আমেরিকাতে। আমেরিকায় যাওয়ার সময় বন্ধু ববি সরদারকে নির্বাহী সম্পাদক হিসাবে দায়িত্বভার দিয়ে যান সাপ্তাহিক জংশনের। ববি সরদার বেশ কিছুদিন যাবৎ পত্রিকাটি চালিয়ে যান, এক সময় তিনি সাপ্তাহিক জংশন ছেড়ে আসেন এবং নিজে উত্তর দেশ নামে একটি সাপ্তাহিক ও উত্তর জনতা নামে আরেকটি দৈনিক পত্রিকার ডিক্লারেশন নিয়ে সাংবাদিকতা করে যাচ্ছেন। ববি সরদার লেখাপড়া করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজশাহী অবস্থানকালে ববি সরদার রাজশাহী থেকে প্রকাশিত দৈনিক বার্তা অফিসে যাতায়াত করতেন, সে সময়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক কামাল লোহানিসহ অনেক নামকরা সাংবাদিকদের সাথে তার যোগাযোগের সুযোগ হয় এবং তাদের কাছ থেকে সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্র সম্পাদনা সম্পর্কে জানারও সুযোগ হয়। পারিবারিকভাবে ববি সরদারের ভাই অ্যাড.মঞ্জুর হোসেন বকুল ছিলেন সত্তর দশকে দৈনিক ইত্তেফাকের ঈশ্বরদীর স্থানীয় প্রতিনিধি, ভাইয়ের কারণেই তার সাংবাদিক হওয়ার চিন্তা মাথায় এসেছিল। ববি সরদার সাংবাদিকতার পাশাপাশি ঈশ্বরদীতে একটি ব্যবসার সাথে জড়িত আছেন। 

ঈশ্বরদীর প্রথম সংবাদ পত্র সাপ্তাহিক জংশন থেকে ববি সরদার চলে আসার পরে পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন জনাব ইয়াহিয়া নয়ন। ইয়াহিয়া নয়ন সাংবাদিক হিসাবে ঢাকার একটি দৈনিকে চাকরি করতেন, এক সময় বিদেশও চলে যান। বিদেশ থেকে ফিরে এসে যতদূর জানা যায় তিনি এখনও সংবাদ পত্রের সাথেই জড়িত আছেন। ইয়াহিয়া নয়নের পরে কিছু সময় বিশিষ্ট সাংবাদিক আলাউদ্দীন আহমেদ পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক হিসাবে কাজ করেছেন, আলাউদ্দীন আহমেদ এখন নিজেই একটি পত্রিকার প্রকাশক সম্পাদক। তিনি বিগত ৩৬ বছর ধরে সম্পাদনা করছেন সাপ্তাহিক জনদাবী।

আলাউদ্দীন আহমেদ জংশন ছেড়ে আসার পর থেকেই আজ তিন যুগের অধিক সময় ধরে সাপ্তাহিক জংশনের নির্বাহী সম্পাদক হিসাবে এস, এম রাজা পত্রিকাটি সম্পাদনা ও প্রকাশ করে যাচ্ছেন। এস,এম রাজা ঈশ্বরদীর পরিচিত মুখ, বেশ কয়েক বছর ঈশ্বরদী প্রেসক্লাবের সভাপতি ছিলেন। তিনি একাধারে একজন কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার, সুরকার ও গায়ক। নিজের লেখা গানে নিজেই সুর করেন, নিজেই কণ্ঠ দেন, মাতিয়ে তোলেন মঞ্চ। আজ পর্যন্ত অনেক গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক তিনি। এস,এম, রাজা একজন ভাববাদী মানুষ, আচার আচরণ ও সাদামাটা জীবন যাপনের কারণে ঈশ্বরদীতে একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব তিনি। এস,এম রাজার প্রচেষ্টায় চার দশকের পত্রিকা ঈশ্বরদীর “সাপ্তাহিক জংশন” আজও প্রকাশিত হচ্ছে।  


ঈশ্বরদী প্রেসক্লাব:

আজ থেকে অর্ধশত বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ঈশ্বরদী প্রেসক্লাব, এটি ঈশ্বরদীর একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৪ সালে সে সময়ের ঈশ্বরদীর বিশিষ্ট সাংবাদিক গোলাম কিবরিয়া, সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম মহিউদ্দিন আহম্মেদ, সাংবাদিক কামাল আহমেদ,  অ্যাড. মঞ্জুর হোসেন বকুল, লতীফ বিশ্বাস, মহসিন রিয়াজিসহ বেশ কয়েকজন প্রগতিশীল মানুষের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় ঈশ্বরদী প্রেসক্লাব। ঈশ্বরদী প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক গোলাম কিবরিয়া ও প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আব্দূল লতিফ বিশ্বাস। প্রেসক্লাবের মাধ্যমে ঈশ্বরদীর সাংবাদিকরা আজও সংগঠিত। প্রথম দিকে ঈশ্বরদী প্রেসক্লাবের কোন স্থায়ী ঠিকানা ছিল না। ১৯৮৮ সাল, যখন ঈশ্বরদী প্রেসক্লাবের সভাপতি মরহুম আব্দুল লতীফ বিশ্বাস ও সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন আহমেদ এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক আহম্মেদ কিরণ। দীর্ঘ সাংবাদিকতার পাশাপাশি প্রায় বছর চারেক ধরে মোস্তাক আহম্মেদ কিরণ সাপ্তাহিক সাতদিন পত্রিকার প্রকাশক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। 

তখন তাদের নেতৃত্বে প্রেসক্লাবের নিজস্ব ভবন তৈরির প্রচেষ্টা শুরু হয়। সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন আহম্মেদ, সামাজিক ব্যক্তিত্ব নুরুল ইসলাম ফকির, বিশিষ্ট সাংবাদিক মহাসিন রিয়াজীসহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব এ প্রচেষ্টায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ঈশ্বরদীর সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও প্রেসক্লাবের নিজস্ব ভবন তৈরিতে সহায়তা করেন। বিশেষভাবে সহায়তা করেন সে সময়ের সংসদ সদস্য মরহুম মঞ্জুর রহমান বিশ্বাস। বর্তমানে ঈশ্বরদী প্রেসক্লাবের সভাপতি সাপ্তাহিক সমকোন পত্রিকার সম্পাদক আব্দুল মান্নান টিপু এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ মেহেদি হাসান। সাংবাদিক শেখ মেহেদী হাসান দৈনিক কালের কণ্ঠের ঈশ্বরদী প্রতিনিধি।

ঈশ্বরদীর সাংবাদিকদের কথা:

প্রথমেই বলেছি, ঈশ্বরদীতে যারা সংবাদপত্রের সাথে জড়িত ছিলেন এবং যারা এখনও জড়িত আছেন, তারা প্রায় সবাই এপথে এসেছিলেন সখের বশে। কেউ কেউ সত্য কথা তুলে ধরার তীব্র তাগিদ নিয়ে জড়িত হয়েছিলেন সংবাদপত্রের সাথে। তারা কিন্তু কেউ অর্থনৈতিকভাবে তেমন প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। সংবাদপত্রে কাজ করেও তারা বেঁচে থাকার জন্য অন্য পেশায় জড়িত ছিলেন। আজকের সংবাদকর্মীদেরও একই অবস্থা, এ যেন বাবার খেয়ে বনের মৌষ তাড়ানো। এভাবেই টিকে আছে ঈশ্বরদীর সংবাদপত্র জগৎ। জানি না এ অবস্থার পরিবর্তন হবে কিনা। তবুও টিকে থাক ঈশ্বরদীর সংবাদপত্র জগৎ।   

ভিশন বাংলা ২৪

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬


ঈশ্বরদীর সংবাদপত্র জগৎ

প্রকাশের তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬

featured Image


বাংলাদেশের একটি প্রসিদ্ধ উপজেলা ঈশ্বরদী। ব্রিটিশ ভারত আমলেই ঈশ্বরদী ছিল ভারতবর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান, ভারতের পশ্চিম অঞ্চলের সাথে উত্তর পূর্ব অঞ্চলের যোগাযোগের এক সুবিধাজনক স্থান ছিল ঈশ্বরদী। সে আমলে পদ্মা নদীর কুষ্টিয়া পাড়ে রাইটা ঘাট এবং পাবনা পাড়ের সাঁড়া স্টিমার ঘাটের অবস্থানের কারণে এবং আজ থেকে শতবর্ষের অধিক সময় পূর্বে হাড্রিঞ্জ ব্রিজ নির্মিত হওয়ায় ঈশ্বরদীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রেলওয়ে জংশন, যার ফলে এক সময় ঈশ্বরদীকে বলা হতো উত্তরবঙ্গের প্রবেশ দ্বার, সেই খ্যাতি আজও আছে। শতবর্ষ আগেই ঈশ্বরদীর পাকশীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়, পরবর্তীতে পাকশীতেই হয়েছিল রেলওয়ের বিভাগীয় কার্যালয়, যা এখনও চলমান। পাকিস্তান আমলে ঈশ্বরদী বিমান বন্দর ও পাকশীতে স্থাপিত হয় দেশের একটি ভারী শিল্প কারখানা “উত্তরবঙ্গ কাগজ কল”। আজ ঈশ্বরদীর রূপপুর গ্রামে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও ঈশ্বরদী ইপিজেড এ অঞ্চলের গুরুত্বকে বাড়িয়েছে আরও বহুগুণ। ঈশ্বরদীতেই  ্আছে দেশের একমাত্র ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র, আছে ডাল গবেষণা কেন্দ্র, আরও আছে অনেকগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এসব কারণেই পাকশী এবং ঈশ্বরদীতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসে উচ্চ শিক্ষিত মানুষসহ নানা পেশার মানুষ। রেলওয়ের চাকরিসূত্রে ব্রিটিশ আমলে পাকশীতে বসবাস ছিল ভারতের নানা প্রদেশের মানুষের, পাকশীতে থাকতেন ইংরেজ সাহেবরাও। এসমস্ত কারণে পাকশী ঈশ্বরদীতে গড়ে উঠেছিল উন্নত সাংস্কৃতিক জগৎ। অত্র এলাকার মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয়েছিল প্রগতিশীল চিন্তা চেতনা। তখন থেকেই এ অঞ্চলের প্রগতিশীল মানুষের মাঝে সংবাদপত্রের প্রতি এক আলাদা ঝোঁক সৃষ্টি হয়, তারই ধারাবাহিককতায় আজকের ঈশ্বরদী সংবাদপত্র জগৎ। পাকিস্তান আমল থেকেই ঈশ্বরদীর বুকে তৈরি হয়েছে অনেক অনেক নিবেদিতপ্রাণ প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকের, যাদের মধ্যে আছেন মরহুম আব্দুর রাজ্জাক, গোলাম কিবরিয়া, মরহুম লতিফ বিশ্বাস, মরহুম অ্যাড.মঞ্জুর হোসেন বকুল, মরহুম মহসিন রিয়াজি, জনাব কামাল আহমেদসহ অনেকে। আরও কয়েকজন শ্রদ্ধাভাজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ঈশ্বরদীতে সাংবাদিক হিসাবে কাজ করেছেন, তাঁরা হলেন কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল, সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন আহমেদ, বিশিষ্ট রাজনীতিবীদ ন্যাপের হালিম চৌধুরী। এসব শ্রদ্ধাভাজন সাংবাদিকদের উত্তরসূরি হিসাবে ঈশ্বরদীর বুকে অনেক প্রতিভাবান সাংবাদিক আজ জাতীয় পত্রিকার স্থানীয় প্রতিনিধি ও স্থানীয় পত্রিকায় কাজ করছেন। যারা এই মফস্বল শহরে সাংবাদিক হিসাবে কাজ করছেন তাদের বেশিরভাগই এটাকে পেশা হিসাবে নেননি, নিয়েছেন নেশা হিসাবে। যারা সংবাদপত্রের সাথে জড়িত আছেন তাদের বেশিরভাগই মনে করেন একটি পত্রিকার সাথে জড়িত থেকে তারা সাংস্কৃতিক জগতের সাথে জড়িত আছেন, জড়িত আছেন শিল্প-সাহিত্য জগতের সাথে। যতদূর জানা যায় বর্তমান সময়ে ঈশ্বরদী থেকে নিয়মিত ও অনিয়মিতভাবে বিশ থেকে একুশটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়, দু’একটি দৈনিক পত্রিকাও প্রকাশিত হয়। একটি মফস্বল শহর থেকে এতগুলো পত্রিকা প্রকাশিত হওয়া সত্যিই এক বিরল ঘটনা বলেই আমার মনে হয়। ঈশ্বরদী থেকে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি পত্রিকার নাম এখানে দেওয়া হলো।

ঈশ্বরদী থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলার বেশকিছু নাম:

সাপ্তাহিক জংশন, সাপ্তাহিক জনদাবী, সাপ্তাহিক বিজয়দীপ্ত, সাপ্তাহিক সংবাদ সাতদিন, সাপ্তাহিক ঈশ্বরদী, প্রথম সকাল, সময়ের ইতিহাস, ঈশ্বরদী বার্তা, পদ্মার খবর, হ্যালো ঈশ্বরদী, চেতনায় ঈশ্বরদী, সাপ্তাহিক সমকোণ, সাপ্তাহিক ঈশ্বরদীর কাগজ, সাপ্তাহিক ঈশ্বরদীর আলো, সাপ্তাহিক জয়পত্র সহ আরও কিছু পত্রিকা নিয়মিত ও অনিয়মিতভাবে প্রকাশ হচ্ছে। ঈশ্বরদী থেকে প্রকাশিত দু তিনটি দৈনিক পত্রিকার কথা জানা যায়। দৈনিক পত্রিকার মধ্যে আছে— দৈনিক বীর বাংলা, দৈনিক উন্নয়নের কথা ও আরো কয়েকটি দৈনিক নিয়মিত-অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। এই লেখাতে সবগুলো পত্রিকার কথা তুলে ধরা সম্ভব না। 

ঈশ্বরদীতে পত্রিকা প্রকাশের ইতিহাস:

ঈশ্বরদীর পত্রিকা প্রকাশের ইতিহাস আজ থেকে চার দশক আগের, গত শতাব্দীর আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। ঈশ্বরদীর সন্তান আতাউর রহমান লেখাপড়া করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগে, ১৯৮৩ সালে লেখাপড়া শেষ করেন, মাথায় চাপে পত্রিকার প্রকাশের নেশা। যতদূর জানি ঈশ্বরদীর বুকে প্রথম একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার ডিক্লারেশন নেন আতাউর রহমান— পত্রিকাটির নাম সাপ্তাহিক জংশন। পত্রিকাটির নামের সাথে ঈশ্বরদীর পরিচিতিও প্রকাশ পায়, ঈশ্বরদী রেলওয়ের জংশন হিসাবে খ্যাত, সম্ভবত একারণেই তিনি পত্রিকার নাম দিয়েছিলেন সাপ্তাহিক জংশন। অল্প সময়ের মধ্যেই পত্রিকাটি ঈশ্বরদীর মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। সেই সময় পত্রিকার সাথে জড়িয়ে পড়ে ঈশ্বরদী-পাকশীর অনেক তরুণ যুবক। অনেকেরই সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয় সাপ্তাহিক জংশনের মাধ্যমে। আতাউর রহমান অল্প কিছুদিন পত্রিকাটি সম্পাদক হিসাবে চালাতে পারেন, কারণ হঠাৎই তাকে চলে যেতে হয় আমেরিকাতে। আমেরিকায় যাওয়ার সময় বন্ধু ববি সরদারকে নির্বাহী সম্পাদক হিসাবে দায়িত্বভার দিয়ে যান সাপ্তাহিক জংশনের। ববি সরদার বেশ কিছুদিন যাবৎ পত্রিকাটি চালিয়ে যান, এক সময় তিনি সাপ্তাহিক জংশন ছেড়ে আসেন এবং নিজে উত্তর দেশ নামে একটি সাপ্তাহিক ও উত্তর জনতা নামে আরেকটি দৈনিক পত্রিকার ডিক্লারেশন নিয়ে সাংবাদিকতা করে যাচ্ছেন। ববি সরদার লেখাপড়া করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজশাহী অবস্থানকালে ববি সরদার রাজশাহী থেকে প্রকাশিত দৈনিক বার্তা অফিসে যাতায়াত করতেন, সে সময়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক কামাল লোহানিসহ অনেক নামকরা সাংবাদিকদের সাথে তার যোগাযোগের সুযোগ হয় এবং তাদের কাছ থেকে সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্র সম্পাদনা সম্পর্কে জানারও সুযোগ হয়। পারিবারিকভাবে ববি সরদারের ভাই অ্যাড.মঞ্জুর হোসেন বকুল ছিলেন সত্তর দশকে দৈনিক ইত্তেফাকের ঈশ্বরদীর স্থানীয় প্রতিনিধি, ভাইয়ের কারণেই তার সাংবাদিক হওয়ার চিন্তা মাথায় এসেছিল। ববি সরদার সাংবাদিকতার পাশাপাশি ঈশ্বরদীতে একটি ব্যবসার সাথে জড়িত আছেন। 

ঈশ্বরদীর প্রথম সংবাদ পত্র সাপ্তাহিক জংশন থেকে ববি সরদার চলে আসার পরে পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন জনাব ইয়াহিয়া নয়ন। ইয়াহিয়া নয়ন সাংবাদিক হিসাবে ঢাকার একটি দৈনিকে চাকরি করতেন, এক সময় বিদেশও চলে যান। বিদেশ থেকে ফিরে এসে যতদূর জানা যায় তিনি এখনও সংবাদ পত্রের সাথেই জড়িত আছেন। ইয়াহিয়া নয়নের পরে কিছু সময় বিশিষ্ট সাংবাদিক আলাউদ্দীন আহমেদ পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক হিসাবে কাজ করেছেন, আলাউদ্দীন আহমেদ এখন নিজেই একটি পত্রিকার প্রকাশক সম্পাদক। তিনি বিগত ৩৬ বছর ধরে সম্পাদনা করছেন সাপ্তাহিক জনদাবী।

আলাউদ্দীন আহমেদ জংশন ছেড়ে আসার পর থেকেই আজ তিন যুগের অধিক সময় ধরে সাপ্তাহিক জংশনের নির্বাহী সম্পাদক হিসাবে এস, এম রাজা পত্রিকাটি সম্পাদনা ও প্রকাশ করে যাচ্ছেন। এস,এম রাজা ঈশ্বরদীর পরিচিত মুখ, বেশ কয়েক বছর ঈশ্বরদী প্রেসক্লাবের সভাপতি ছিলেন। তিনি একাধারে একজন কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার, সুরকার ও গায়ক। নিজের লেখা গানে নিজেই সুর করেন, নিজেই কণ্ঠ দেন, মাতিয়ে তোলেন মঞ্চ। আজ পর্যন্ত অনেক গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক তিনি। এস,এম, রাজা একজন ভাববাদী মানুষ, আচার আচরণ ও সাদামাটা জীবন যাপনের কারণে ঈশ্বরদীতে একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব তিনি। এস,এম রাজার প্রচেষ্টায় চার দশকের পত্রিকা ঈশ্বরদীর “সাপ্তাহিক জংশন” আজও প্রকাশিত হচ্ছে।  


ঈশ্বরদী প্রেসক্লাব:

আজ থেকে অর্ধশত বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ঈশ্বরদী প্রেসক্লাব, এটি ঈশ্বরদীর একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৪ সালে সে সময়ের ঈশ্বরদীর বিশিষ্ট সাংবাদিক গোলাম কিবরিয়া, সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম মহিউদ্দিন আহম্মেদ, সাংবাদিক কামাল আহমেদ,  অ্যাড. মঞ্জুর হোসেন বকুল, লতীফ বিশ্বাস, মহসিন রিয়াজিসহ বেশ কয়েকজন প্রগতিশীল মানুষের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় ঈশ্বরদী প্রেসক্লাব। ঈশ্বরদী প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক গোলাম কিবরিয়া ও প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আব্দূল লতিফ বিশ্বাস। প্রেসক্লাবের মাধ্যমে ঈশ্বরদীর সাংবাদিকরা আজও সংগঠিত। প্রথম দিকে ঈশ্বরদী প্রেসক্লাবের কোন স্থায়ী ঠিকানা ছিল না। ১৯৮৮ সাল, যখন ঈশ্বরদী প্রেসক্লাবের সভাপতি মরহুম আব্দুল লতীফ বিশ্বাস ও সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন আহমেদ এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক আহম্মেদ কিরণ। দীর্ঘ সাংবাদিকতার পাশাপাশি প্রায় বছর চারেক ধরে মোস্তাক আহম্মেদ কিরণ সাপ্তাহিক সাতদিন পত্রিকার প্রকাশক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। 

তখন তাদের নেতৃত্বে প্রেসক্লাবের নিজস্ব ভবন তৈরির প্রচেষ্টা শুরু হয়। সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন আহম্মেদ, সামাজিক ব্যক্তিত্ব নুরুল ইসলাম ফকির, বিশিষ্ট সাংবাদিক মহাসিন রিয়াজীসহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব এ প্রচেষ্টায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ঈশ্বরদীর সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও প্রেসক্লাবের নিজস্ব ভবন তৈরিতে সহায়তা করেন। বিশেষভাবে সহায়তা করেন সে সময়ের সংসদ সদস্য মরহুম মঞ্জুর রহমান বিশ্বাস। বর্তমানে ঈশ্বরদী প্রেসক্লাবের সভাপতি সাপ্তাহিক সমকোন পত্রিকার সম্পাদক আব্দুল মান্নান টিপু এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ মেহেদি হাসান। সাংবাদিক শেখ মেহেদী হাসান দৈনিক কালের কণ্ঠের ঈশ্বরদী প্রতিনিধি।

ঈশ্বরদীর সাংবাদিকদের কথা:

প্রথমেই বলেছি, ঈশ্বরদীতে যারা সংবাদপত্রের সাথে জড়িত ছিলেন এবং যারা এখনও জড়িত আছেন, তারা প্রায় সবাই এপথে এসেছিলেন সখের বশে। কেউ কেউ সত্য কথা তুলে ধরার তীব্র তাগিদ নিয়ে জড়িত হয়েছিলেন সংবাদপত্রের সাথে। তারা কিন্তু কেউ অর্থনৈতিকভাবে তেমন প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। সংবাদপত্রে কাজ করেও তারা বেঁচে থাকার জন্য অন্য পেশায় জড়িত ছিলেন। আজকের সংবাদকর্মীদেরও একই অবস্থা, এ যেন বাবার খেয়ে বনের মৌষ তাড়ানো। এভাবেই টিকে আছে ঈশ্বরদীর সংবাদপত্র জগৎ। জানি না এ অবস্থার পরিবর্তন হবে কিনা। তবুও টিকে থাক ঈশ্বরদীর সংবাদপত্র জগৎ।   


ভিশন বাংলা ২৪

Advisory Editor: Syed Shajahan Saju, Adviser: Advocate Shajan Majumder, Chief Editor: Tuhin Bhuiyan, Executive Editor: S.M. Kamal, Managing Editor: Bayzid Bostami, Asst. Editor: Sahara Moon, Asst. Editor: Azgar Ali
কপিরাইট © ২০২৬ ভিশন বাংলা ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত