জামিনে বেরিয়ে বাদীকে হুমকির অভিযোগ, সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস নেতাদের
চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার যুবদল নেতা শামীম বহিষ্কার না হওয়ায় ক্ষোভ
গাজীপুর সদর উপজেলার ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাব্বির আহমেদ শামীমকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। চাঁদাবাজি ও হামলার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার পর জামিনে মুক্তি পেয়ে মামলার বাদী নুরুদ্দিন খন্দকারকে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এতসব অভিযোগের পরও দলীয়ভাবে তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় তৃণমূল নেতাকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
স্থানীয় সূত্র, মামলা-সংক্রান্ত নথি এবং পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ জুন গাজীপুর সদর উপজেলার ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের রুদ্রপুর এলাকায় চাঁদা দাবির অভিযোগে স্থানীয় লোকজন সাব্বির আহমেদ শামীমকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। পরে জয়দেবপুর থানা পুলিশ তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠায়।
মামলার বাদী নুরুদ্দিন খন্দকারের ভাষ্য, রুদ্রপুর এলাকায় নিজের ক্রয় করা জমিতে বালু ভরাটের কাজ চলাকালে গত ৭ জুন বিকেলে শামীম ও তার কয়েকজন সহযোগী সেখানে উপস্থিত হয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং জমির উন্নয়নকাজ বন্ধ রাখার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, পরদিন ৮ জুন সকালে পুনরায় কাজ শুরু হলে শামীম ও তার সহযোগীরা আবারও ঘটনাস্থলে গিয়ে চাঁদা দাবি করেন। একপর্যায়ে নুরুদ্দিন খন্দকারের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে মারধর করা হয়। এতে তিনি আহত হন। অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, হামলার সময় তার গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টাও করা হয়। তার চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন। পরে উত্তেজিত জনতা শামীমকে আটক করে রাখলে তার সহযোগীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
ঘটনার পর নুরুদ্দিন খন্দকার জয়দেবপুর থানায় মামলা করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ৪৪৭, ৩২৩, ৩০৭, ৩৮৫ ও ৫০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে জামিনে মুক্তি পান সাব্বির আহমেদ শামীম।
আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরও সাব্বির আহমেদ শামীমের বিরুদ্ধে মামলার বাদী নুরুদ্দিন খন্দকারকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় গত ১৩ জুন জয়দেবপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন নুরুদ্দিন খন্দকার। জিডি নম্বর-৬৪৫। জিডিতে তিনি অভিযোগ করেন, মামলার পর থেকেই শামীম ও তার সহযোগীরা ধারাবাহিকভাবে তাকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দিয়ে আসছেন। ১২ জুন দুপুরে শামীম কয়েকজন সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে তার বাড়ির সামনে গিয়ে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য জোরাজুরি করেন। এতে তিনি অস্বীকৃতি জানালে তাকে গালিগালাজ করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, একপর্যায়ে শামীম একটি ধারালো ছোরা প্রদর্শন করে তাকে হত্যার হুমকি দেন। শুধু তাই নয়, মামলা প্রত্যাহার না করলে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করারও হুমকি দেওয়া হয় বলে জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নুরুদ্দিন খন্দকারের দাবি, গ্রেফতার ও মামলার পরও অভিযুক্তদের আচরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং জামিনে বেরিয়ে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এ কারণে তিনি নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত বলে জানিয়েছেন।
অন্যদিকে সাব্বির আহমেদ শামীম শুরু থেকেই চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মতে, চাঁদাবাজি ও হামলার অভিযোগে গ্রেফতারের পর জামিনে বেরিয়ে আবার বাদীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠা ঘটনাটিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। তাদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন এবং সত্যতা পাওয়া গেলে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অভিযোগগুলো প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে যুবদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শামীমের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো সাংগঠনিক পদক্ষেপের তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভাওয়ালগড় ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম রবিন বলেন, “বিষয়টি ভাইরাল হওয়ার পর আমরা অবগত হয়েছি। তবে তার বিরুদ্ধে মাদকসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়টি আগে জানা ছিল না। সাংগঠনিকভাবে যাচাই-বাছাই করে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
গাজীপুর সদর উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব এমারত হোসেন মুসুল্লি বলেন, “নিউজপোর্টাল, দৈনিক পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি দেখেছি। নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
সদর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক নাজিম সরকার বলেন, “বিষয়টি আমরা অবগত আছি। লিখিত অভিযোগ পেলে এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই সাপেক্ষে দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
গাজীপুর জেলা যুবদলের আহ্বায়ক আতাউর রহমান মোল্লা বলেন, “পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও সংশ্লিষ্ট তথ্য আমরা কেন্দ্রীয় নেতাদের নজরে এনেছি। সেখান থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানানো যাবে।”
এদিকে রুদ্রপুর ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের প্রশ্ন, চাঁদাবাজির অভিযোগে জনতার হাতে আটক হয়ে পুলিশের মাধ্যমে কারাগারে যাওয়ার পরও এবং জামিনে মুক্তি পেয়ে বাদীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পরও যদি কোনো নেতার বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তাহলে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এতে একদিকে যেমন সংগঠনের শৃঙ্খলা বজায় থাকবে, অন্যদিকে তৃণমূল নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছেও ইতিবাচক বার্তা যাবে।
জামিনে মুক্তির পর বাদীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি সাব্বির আহমেদ শামীমকে ঘিরে আরও নানা অভিযোগ সামনে এনেছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এলাকায় বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকলেও প্রভাবের কারণে সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বাসিন্দা জানান, শামীমের বিরুদ্ধে মাদকসেবন ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তাদের ভাষ্য, তিনি নিয়মিত ইয়াবা ও গাঁজা সেবনের পাশাপাশি ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত বলে এলাকায় প্রচলিত অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কয়েক বছর আগে রাজেন্দ্রপুর এলাকায় গোপনে বাংলা মদ বিক্রির সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন বলে দাবি করেন সচেতন মহলের কয়েকজন।
এদিকে শামীমের পরিবারকেও ঘিরে এলাকায় নানা আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, তার ভাই সুজন মিয়া পূর্বে অটোরিকশা চোরচক্র-সংশ্লিষ্ট একটি আলোচিত মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুদ্রপুর এলাকার কিশোর অটোরিকশাচালক রাসেল বেপারী হত্যাকাণ্ড এবং অটোরিকশা চুরির ঘটনায় পরিচালিত পুলিশের অভিযানে সুজন মিয়াসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। ওই ঘটনার পর থেকেই পরিবারটি নিয়ে এলাকায় নেতিবাচক আলোচনা আরও জোরালো হয় বলে দাবি স্থানীয়দের।