একই রোগীর প্লাটিলেটে দফায় দফায় ভিন্ন রিপোর্ট
ধোলাইপারে মেডি বাংলা হাসপাতালের ল্যাব নিয়ে তীব্র প্রশ্ন
রাজধানীর ধোলাইপারের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘মেডি বাংলা হাসপাতাল’-এ প্যাথলজি পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে এক নজিরবিহীন ও উদ্বেগজনক বিভ্রাটের অভিযোগ উঠেছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একই শিশুর রক্ত পরীক্ষায় প্লাটিলেট কাউন্টের বিশাল ফারাক দেখিয়ে জরুরি টনসিল অপারেশন আটকে দেওয়ার মতো গুরুতর ঘটনা ঘটেছে। চিকিৎসকের অভিযোগের ভিত্তিতে জানা যায়, ভুল ও বিভ্রান্তিকর রিপোর্টের কারণে পুরো চিকিৎসা পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে যায় এবং চরম ভোগান্তির মুখে পড়ে অপারেশন বন্ধ রেখে শিশুটিকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়।
বরিশাল থেকে উন্নত চিকিৎসার আশায় নয় বছর বয়সী ওই শিশুটিকে ঢাকায় এনে সকাল সাড়ে আটটার দিকে ধোলাইখালের মেডি বাংলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দুপুর দেড়টা থেকে দুইটার মধ্যে তার টনসিলেক্টমি অপারেশন সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। সে অনুযায়ী শিশুটিকে সকাল থেকেই অভুক্ত (না খেয়ে) অপারেশনের পূর্ণ প্রস্তুতিতে রাখা হয়। কিন্তু দুপুরের দিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, শিশুটির রক্তে প্লাটিলেট মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার, যা অপারেশনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং এই অবস্থায় টনসিল অপারেশন করা সম্ভব নয়।
অপারেশনকারী চিকিৎসক এমন রিপোর্টে সন্দেহ প্রকাশ করে বিষয়টি নিশ্চিত হতে অন্য নির্ভরযোগ্য ল্যাব থেকে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন। কিন্তু অন্য ল্যাবে না পাঠিয়ে মেডি বাংলা হাসপাতালেই পরপর আরও দুইবার শিশুটির রক্ত পরীক্ষা করা হয়। অবিশ্বাস্যভাবে দ্বিতীয় রিপোর্টে প্লাটিলেট দেখানো হয় ১ লাখ ৪১ হাজার এবং তৃতীয় রিপোর্টে আসে ১ লাখ ৩৫ হাজার। একই হাসপাতালে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একই রোগীর প্লাটিলেটের এমন অস্বাভাবিক ও পরিবর্তনশীল ফলাফল দেখে চিকিৎসকের মনে বড় ধরনের সন্দেহের সৃষ্টি হয়। তা সত্ত্বেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অপারেশন করতে অপারগতা প্রকাশ করলে অচলাবস্থা তৈরি হয়।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কোনো উপায় না পেয়ে স্বজনরা শিশুটিকে পাশের ইসলামিয়া মডেল হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। সেখানে নিয়ে দুটি পৃথক ও সুপ্রতিষ্ঠিত ল্যাবে রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। যার মধ্যে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ডায়াগনস্টিক সেন্টার ইবনে সিনার রিপোর্টে শিশুটির প্লাটিলেট আসে ২ লাখ ১৩ হাজার এবং অন্য আরেকটি ল্যাবের পরীক্ষায় আসে ৩ লাখ ১০ হাজার। যেখানে স্বাভাবিক প্লাটিলেট থাকায় স্পষ্ট হয়ে যায় যে শিশুর অপারেশনে কোনো ঝুঁকিই ছিল না, অথচ ভুল রিপোর্টের কারণে পুরো দিন অভুক্ত থেকে শারীরিক ও মানসিক নিদারুণ যন্ত্রণার শিকার হতে হয়েছে শিশু ও তার পরিবারকে। পরবর্তীতে রাত সাড়ে বারোটার দিকে অন্য একটি হাসপাতালে শিশুটির টনসিলেক্টমি সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
অভিযোগ উঠেছে, মেডি বাংলা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কাছাকাছি সময়ে পরপর তিনবার পরীক্ষা করে প্রতিবারই রোগীর কাছ থেকে আলাদা করে বিল আদায় করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, একই হাসপাতালে কাছাকাছি সময়ে তিনবার পরীক্ষা কেন করা হলো এবং কোন রিপোর্টটি তাদের সঠিক ছিল? যদি প্রথম রিপোর্ট ভুল হয়ে থাকে, তবে পরবর্তী রিপোর্ট সঠিক হওয়ার পরও কেন ওই শিশুর অপারেশন বন্ধ রাখা হলো? আর যদি সব রিপোর্টই ত্রুটিপূর্ণ হয়, তবে সেই প্যাথলজি ল্যাবের বৈধতা ও মান নিয়ে গভীর প্রশ্ন জাগে। একটি ভুল প্যাথলজি রিপোর্ট একজন রোগীর জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে, অপারেশন বন্ধ করে দিতে পারে এবং পরিবারকে চরম বিপর্যয়ে ফেলতে পারে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের স্পষ্ট দাবি, এটি কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নয়; একজন চিকিৎসকের নৈতিক দায়িত্ববোধ এবং রোগীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই সত্য উন্মোচন জরুরি। মেডি বাংলা হাসপাতালের মালিক ও অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ডা. আরিফ হোসেনের কাছে এ বিষয়ে বক্তব্য এবং ব্যবহৃত প্যাথলজি মেশিনের নিরপেক্ষ তদন্ত চাওয়া হয়েছে। হাসপাতালটির ল্যাব মেশিনের ক্যালিব্রেশন, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, ব্যবহৃত রিএজেন্ট, নমুনা সংরক্ষণ এবং রিপোর্টিং প্রক্রিয়ার সঠিক মান আন্তর্জাতিক বা জাতীয় মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। চিকিৎসা বাণিজ্য কখনোই রোগীর অসহায়ত্বকে জিম্মি করে হতে পারে না।
উক্ত হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়ম, ভুল রিপোর্ট ও অপচিকিৎসার নানা অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চলছে। মেডি বাংলা হাসপাতালের ভেতরের চিত্র নিয়ে আমাদের ধারাবাহিক অনুসন্ধানের দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হবে শীঘ্রই।
—প্রিয় পাঠক, আপনার কাছেও স্বাস্থ্যসেবা খাতের যে কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য থাকলে আমাদের সঙ্গে শেয়ার করুন, চোখ রাখুন আমাদের প্রতিবেদনে।
