নির্বাচন ছাড়াই চলছে সিটি করপোরেশন, বিতর্ক তুঙ্গে
অসাংবিধানিকভাবে চলছে সিটি করপোরেশন?
দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা, জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি, দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়া এবং সরকারি নিয়োগের মাধ্যমে দায়িত্ব পালনের বিষয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—সিটি করপোরেশনগুলো কি অসাংবিধানিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে?
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবিধানের মূল চেতনা অনুযায়ী জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচিত মেয়র বা কাউন্সিলর না থাকায় প্রশাসক কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এতে স্থানীয় সরকারের গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে মত তাদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কয়েকটি সিটি করপোরেশনে মেয়র পদ শূন্য থাকার পর দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। কোথাও আবার নির্বাচনের নির্ধারিত সময় পার হলেও ভোট আয়োজন করা হয়নি। ফলে নাগরিক সেবা অব্যাহত থাকলেও জনগণের প্রত্যক্ষ জবাবদিহিতা অনুপস্থিত রয়েছে।
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে নানা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কারণে সেই সময়সীমা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আইনের ব্যত্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদে সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক।
স্থানীয় সরকার বিশ্লেষকরা বলছেন, সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালনার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। সেই আলোকে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দীর্ঘদিন দায়িত্বে রাখা সংবিধানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সাময়িকভাবে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হওয়া উচিত নয়। দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করে জনগণের ভোটে নির্বাচিত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাই হবে গণতান্ত্রিক সমাধান।
অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো সিটি করপোরেশনে প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হলে নাগরিক সেবা বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ, পানি নিষ্কাশন, ট্রেড লাইসেন্সসহ দৈনন্দিন কার্যক্রম সচল রাখতে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এটি আইনগত কাঠামোর মধ্যেই করা হচ্ছে বলেও দাবি তাদের।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হলে নিয়মিত নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় জনগণের অংশগ্রহণ কমে যাবে এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা বাড়ছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অভিযোগ করছে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রাখতেই নির্বাচন বিলম্বিত করা হচ্ছে। যদিও সরকারপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, আইন ও পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কার্যকর ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে রাখতে হলে সময়মতো নির্বাচন আয়োজন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতায়ন জরুরি। অন্যথায় “অসাংবিধানিকভাবে পরিচালনার” বিতর্ক আরও তীব্র হতে পারে।