ঘুষ নিয়েও কথা রাখেননি কদমতলীর এসআই দেব কুমার দাস
দাবি ৫ লাখ, ৪০ হাজার খেয়ে পল্টি
ডিএমপির কদমতলী থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) দেব কুমার দাস। চলনে বলনে বেশ স্মার্ট। ভাবসাবে পুরাই কেতাদুরস্ত। তবে তিনি তারচেয়েও বেশি সিদ্ধহস্ত মানুষকে ছয়নয় বুঝিয়ে মামলার বক্তব্য উল্টে দিতে। তিনি আরো বেশি দুঃসাহসী খোদ থানা কম্পাউন্ডে সরকারি চেয়ার টেবিলে বসেই রক্তচোক্ষু দেখিয়ে অসহায় মানুষদের থেকে টাকার বান্ডিল বগলদাবা করতে। এমনটাই করেছেন তিনি গত ০৯/১১।/২০২৫ ইং তারিখ আনুমানিক সকাল ১০ ঘটিকায়। তিনি কদমতলী থানার নিচতলার পূর্ব-উত্তর পাশের কোনার রুমে বসে চকচকে ৪০ হাজার টাকার বান্ডেল ঘুষ গ্রহণ করেন। এবং তা টেবিলের নিচে আড়াল করে পইপই করে গুনে নেন।
এই ঘুষ গ্রহণের ঘটনার মূলে যেতে হলে আপনাকে একটি নাটকীয় অপরাধের ঘটনার বর্ণনা শুনতে হবে।
রাজধানী কদমতলী থানার একটি সংঘবদ্ধ চক্র। যারা প্রতিনিয়ত মানুষকে বিভিন্ন প্রলোভনে ফেলে ভয় ভীতি দেখিয়ে অসহায় বা লোভাতুর মানুষদের জিম্মি করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে থাকে। কখনোবা তারা মানুষকে নারীর ফাঁদে ফেলে, কখনোবা দামি কোন কিছুর লোভ দেখায়, কখনোবা নেশার অন্ধকার জগতে হাতছানি দিয়ে ডেকে নিয়ে টাকা পয়সা আদায় করে। তাদের এই পাতানো ফাঁদের একাধিক ভিডিও এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। এই চক্রের মূল হোতা সোহাগ। তার একটি গাড়ির গারেজ আছে কদমতলী থানার কুদার বাজার এলাকায়। তার সব চেয়ে বড় পরিচয় সে স্থানীয় জুম্মন চেয়ারমানের ভাগিনা। জুম্মন চেয়ারমান দীর্ঘ ২৮ বছরের জনপ্রতিনিধি। একসময় তিনি মেম্বার ছিলেন। এখন চেয়ারমান। মামা চেয়ারমান হওয়ার সুবাদে তার নাম ভাংগিয়ে ভাগিনা এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব চালিয়ে আসছে, হেন অপরাধ নেই যা সে করে না। সোহাগের সহকারী হিসেবে আছে নামধারী ভূয়া সাংবাদিক শহিদুল ইসলাম রাজু, সাইদুর রহমান ওরফে সাইফুল, সুমন ওরফে ডেওয়া সুমন, শরিফ ওরফে বান্দর শরিফ আর বদরুল দারোয়ানসহ কয়েকজন।
সোহাগ-রাজু-সাইফুলের এই চক্রটি তক্ষক বিক্রি করবে বলে ক্রেতা খুঁজছিল। তক্ষক মূলত তাদের ফাঁদ। এই তক্ষকের ফাঁদে ফেলতে তারা কথা বলে মো. ফরিদ, পিতা: আব্দুল বারি, আব্দুল ওয়াহাব, পিতা: আব্দুল মান্নান এর সাথে। ২০ লাখ টাকার তক্ষক বিক্রি করবে সোহাগ-রাজু-সাইফুল। ফরিদ-আব্দুল ওয়াহাবরা তাদের পাতানো ফাঁদে পরে টোপ গিলে। এরই সূত্রে গত ০৮/১১/২০২৫ ইং তারিখ সকাল আনুমানিক ১০:০০ টার দিকে তক্ষক দেখতে ফরিদ ও আব্দুল ওয়াহাব কদমতলী থানার কুদারাবাজার এলাকায় আসে। তখন ওৎ পেতে থাকা সোহাগের লোকেরা কৌশলে ফরিদ-আব্দুল ওয়াহাবকে সালাউদ্দীনের নির্মাণাধীন বাড়ির ৩ তলায় নিয়ে যায়। সেখানে নিয়েই ফরিদ ও ওয়াহাবকে সোহাগ রাজু সাইফুল সহ কয়েকজন মিলে বেঁধে ফেলে। তাদের মোবাইল কেড়ে নিয়ে বন্ধ করে দেয়। সাথে লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটাতে থাকে। ভূয়া সাংবাদিক রাজু তার নিজস্ব ইলেকট্রনিক শক দেওয়ার মেশিন দিয়ে দু'জনকে একের পর এক গোপনাঙ্গে শক দিতে থাকে।
সোহাগ রাজু সাইফুল তখন ৫ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। টাকা না দিলে মেরে ফেলার ভয় দেখায়। বাধ্য হয়ে ফরিদ ও আব্দুল ওয়াহাব মুক্তিপণের টাকা নিয়ে আসতে পরিচিত জনদের কল দেয়। বলে, দ্রুত টাকা নিয়ে আসো, নয়তো আমাদের মেরে ফেলবে। তখন তাদের পরিচিত কয়েক জন মুক্তিপণের টাকা নিয়ে বিকেল আনুমানিক ৩ টার দিকে কুদারা বাজার এলাকায় আসে। এসেই তারা স্থানীয় চেয়ারম্যান এর কার্যালয় যায় সাহায্যর জন্য। জুম্মন চেয়ারম্যান তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত শোনেন। জুম্মন চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলার সময় চক্রটি আবারো মোবাইলে কল দিয়ে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।
জুম্মন চেয়ারম্যান নিজ কানে মুক্তিপণের কথা শুনে স্থানীয় লোকজন জড়ো করেন এবং ঐ বাড়ি খুঁজতে থাকেন। প্রায় ঘন্টাখানেক খুঁজার পর হোয়াটসঅ্যাপের লাস্ট লোকেশন এর সূত্র ধরে সালাউদ্দিনের নির্মাণাধীন ১০ তলা বিল্ডিং এর ৩ তলা থেকে ফরিদ ও আব্দুল ওয়াহাব কে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে। আর ঘটনাস্থল থেকে জুম্মন চেয়ারম্যান ও স্থানীয় জনতা ভূয়া সাংবাদিক রাজু ও সাইফুলকে হাতেনাতে ধরে হাত পা বেঁধে পিটুনি দেয়। মারতে মারতে তাদেরকে নির্মাণাধীন বিল্ডিং থেকে নামিয়ে পাশে অবস্থিত সোহাগের গ্যারেজে নিয়ে এসে আটকে রাখে।
বিকেল বেলা জুম্মন চেয়ারম্যান কদমতলী থানায় কল দিলে মাগরিব আজানের সময় এসআই মাহবুবুর রহমান ও এসআই দেব কুমার দাস বাইকে করে সিভিল পোশাকে উপস্থিত হন। তারা ফরিদ ও আব্দুল ওয়াহাব কে চেয়ারম্যান এর কার্যালয় থেকে অসুস্থ ও অপ্রকৃতস্থ অবস্থায় উদ্ধার করেন। আর ভূয়া সাংবাদিক রাজু ও সাইফুলকে গ্রেফতার করেন সোহাগের গ্যারেজ থেকে। পুলিশ উপস্থিত জনতার সামনে চার জনেরই জবানবন্দি গ্রহণ করেন।
কিছুক্ষণ পর কদমতলী থানার ডাবল কেবিনের পিকাপ এসে হাজির হয়। সেই সরকারী পিকাপে করে সবাইকে থানায় নিয়ে আসে পুলিশ। তখন সোহাগের গারেজ থেকে সোহাগের মালিকানাধীন মোটরসাইকেল এফজেড ভার্সন-২, যার রেজিস্টেশন নাম্বার বরিশাল মেট্রো-ল ১২-০৬১২ কদমতলী থানার এসআই মাহবুবুর রহমান জব্দ করে স্থানীয় জনতার সহযোগীতায় গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে আসেন। মামলা রুজু হওয়ার সময় থানা কম্পউন্ডে সোহাগের মোটর সাইকেলটি থাকলেও তা মামলার কোথাও উল্লেখ করেননি মামলার বাদি এসআই মাহবুবুর রহমান। এমনকি এ বিষয়ে কোন জিডি নোটও দেননি তিনি। কোন আইনে বা কোন ক্ষমতাবলে তিনি মোটরসাইকেলটি থানায় আটকে রাখলেন আর কেনইবা তিনি সেটা মামলার এজাহারে বা জব্দ তালিকায় উল্লেখ করলেন না, এবিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন ................ এই প্রতিবেদন লেখার সময়ও থানা কম্পাউন্ডে মোটরসাইকেলটি দেখা যায়।
থানা কম্পাউন্ডে অবৈধভাবে বাইক আটকে রাখার বিষয়টি জানেন কিনা জানতে চাইলে তৎকালীন ওসি অমুক বলেন, ...
ফরিদ ও আব্দুল ওয়াহাব এর লোকজন কদমতলী থানা থেকে তাদেরকে ছাড়িয়ে নিতে আসলে এসআই মাহবুবুর রহমান ও এসআই দেব কুমার দাস ৫ লক্ষ টাকা দাবি করেন। সর্বশেষ ফরিদ ও আব্দুল ওয়াহাবকে নিয়মিত মামলার আসামি না বানিয়ে ডিএমপি করার শর্তে ৪০০০০/- টাকায় রফাদফা হয়।
কথা মতো ফরিদ-ওয়াহাব এর লোকজন পর দিন ০৯/১১/২০২৫ ইং তারিখ সকাল আনুমানিক ৯:৩৫ মিনিটে কদমতলীর মেরাজনগর অবস্থিত ডাচ্ বাংলা ব্যাংকের ফাস্ট ট্র্যাক থেকে ২০ হাজার করে ২ কিস্তিতে মোট ৪০ হাজার টাকা উত্তোলন করেন। টাকা তোলার আনুমানিক আধ ঘন্টা পর সকাল ১০ টার দিকে কদমতলী থানায় আসেন। এর ভেতর এসআই দেব কুমার দাস তাড়াতাড়ি টাকা নিয়ে আসার জন্য বেশ কয়েকবার হোয়াটসআপে কল দিয়ে তাগিদ দিতে থাকেন। ভিক্টিমের লোক টাকা নিয়ে আসলে এসআই দেব কুমার দাস থানা ভবনের পূর্ব - উত্তর পাশের কোনার রুমে বসে ৪০ হাজার টাকা নিজ হাতে গ্রহণ করেন। টাকার বান্ডিল হাতে পেয়ে টেবিলের নিচে নিয়ে গুনে বুঝে নেন। ঘুষ গ্রহণ ও ঘুষের টাকা গণনার সম্পূর্ণ ভিডিও এই প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।
তবে ৪০ হাজার টাকা ঘুষ পাওয়ার পরও কথা রাখেননি কদমতলী থানা পুলিশ। ডিএমপি করেনি কাউকে। টাকা পেয়ে বেমালুম ভুলে যায় তারা। এর কিছুক্ষণ পরই ফরিদ ও ওয়াহাব এর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা রুজু করে কোর্টে পেরণ করে দেয়। মামলা নং...।
কবি শামসুর রাহমানের একটা কবিতা আছে, 'সরকারি প্রেসনোটের মতো মিথ্যা তোমার প্রেম'। এই মামলার এজাহার পর্যালোচনা করলে মনে হয় কবি বেঁচে থাকলে হয়তো লিখতেন, কদমতলী থানার মামলার এজাহারের মতো মিথ্যা তোমার প্রেম।
বাস্তবে যা ঘটেছে তা না লিখে একেবারে ভিন্ন একটি গল্পের অবতারণা করা হয়েছে মামলার এজাহারে। মূলত ফরিদ - ওয়াহাবকে তক্ষকের প্রলোভন দেখিয়ে ডেকে আনে সোহাগ রাজু সাইফুল গ্রুপ। সেই তক্ষকের কথা এজাহারের কোথাও উল্রেখ না করে সোহাগ রাজু সাইফুলদের গোপন ডেরা থেকে জনগণ কর্তৃক উদ্ধারকৃত একটি মূর্তি নিয়ে মামলা দায়ের করে। আসলে এই মূর্তি কেনা বেচার কোন কথাই কেউ সেদিন কারো সাথে বলেনি। এই মূর্তি সোহাগ রাজু সাইফুল বিভিন্ন সময় বিভিন্নজনকে ফাঁদে ফেলার কাজে ববহার করতো। ২ পক্ষের কথোপকথন পর্যালোচনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। এ বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণ এই প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।
এই ঘটনার সব চেয়ে বড় ও এক নম্বর সাক্ষী স্থানীয় জুম্মন চেয়ারম্যান। অথচ তার কথা কোথাও উল্লেখ করা হয়নি মামলার এজাহারে। স্বাক্ষী তালিকায় দিয়েছে একেবারে শেষ দিকে যুক্ত হওয়া কয়েকজনের নাম।
মামলার এজাহারে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি- এখানে দুইটি লোককে একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পনা মাফিক ফাঁদে ফেলে মুক্তিপণ দাবি করেছিল।
বরং লেখা হয়েছে তারা পাশ্ববর্তী দেশে পাচারের জন্য নাকি মূর্তি কেনা বেচা করছিল আর এলাকার লোকজন তাদের ধরে মারপিট করে। যা একেবারেই ভুল তথ্য, এর কোন বাস্তবতা নেই।
এছাড়াও মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত ইলেকটিক শক দেওয়ার মেশিনের কথা এজাহার বা জব্দ তালিকায় কোথাও উল্লেখ নেই। অথচ এটার কথা ভূয়া সাংবাদিক রাজু সবার সামনে যাত্রাবাড়ী থেকে কিনে আনার কথা অকপটে স্বীকার করেছে। সেই ভিডিওও রয়েছে এই প্রতিবেদকের কাছে।
সোহাগ রাজু সাইফুলদের ডেরা থেকে ফরিদ-ওয়াহাবকে মুক্ত করার ঘটনায় সম্মুখ সাড়িতে নেতৃত্ব দেয়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধি জুম্মন চেয়ারমানকে এবিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন....
৪০ হাজার টাকা ঘুষ গ্রহণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কদমতলী থানার এসআই দেব কুমার দাস বলেন...
এ মামলার অসংগতিগুলো সম্পর্কে তৎকালীন অফিসার ইনচার্জ (ওসি) অমুককে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ...
জুম্মন চেয়ারম্যান থেকে জানতে হবে...
মূলত সেদিন কী ঘটেছিল?
মামলায় লেখা হয়েছে, মূর্তি কেনা বেঁচার সময় জনগণ ধরে মারধর করেছে ৪ জনকে। এটা কতটা ঠিক?
পুলিশকে কে কল দিয়েছিল? থানার কাকে কল দেয়া হয়েছিল?
পুলিশ ৪০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছে। এটাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
সোহাগ কি আপনার পরিচিত? কি হয় সে আপনার?
সোহাগ কোথায়?
সোহাগ এর মোটরসাইকেল পুলিশ নিয়ে গিয়েছিল। সেটা কি ফেরত পেয়েছে? কোন বিনিময় লেগেছে?