মামলায় জামিনে এসে আবারও সাংবাদিককে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ
গাজীপুরে সাংবাদিকের ওপর হামলার মামলার পর অভিযুক্ত রাসেলকে ঘিরে বন দখল ও চাঁদাবাজির একাধিক অভিযোগ
গাজীপুরে সরকারি খাসজমি দখলের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হওয়া দৈনিক নয়া দিগন্ত-এর জয়দেবপুর প্রতিনিধি আব্দুল আজিজ চিকিৎসা শেষে গত শনিবার (২৭ জুন) রাতে জয়দেবপুর থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় স্থানীয় যুবদল নেতা আরাফাত রহমান রাসেলকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এছাড়া তার সহযোগী হিসেবে ৮-১০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে।
জয়দেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মামলাটি গ্রহণ করা হয়েছে এবং আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
অভিযোগ রয়েছে, মামলা দায়েরের পরও পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। পরে ২৯ জুন (সোমবার) আদালত থেকে জামিনে বের হয়ে আরাফাত রহমান রাসেল পুনরায় সাংবাদিক আব্দুল আজিজকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী সাংবাদিক।
এর আগে জেলা প্রশাসকের খতিয়ানভুক্ত সরকারি জমি দখলের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন আব্দুল আজিজ। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
বনভূমি দখল, অবৈধ বসতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
মামলার পর স্থানীয় বাসিন্দা, বন বিভাগের একাধিক সূত্র এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আরাফাত রহমান রাসেলের বিরুদ্ধে সংরক্ষিত বনভূমি দখল, সরকারি জমি জবরদখল, অবৈধ বসতি স্থাপন, চাঁদাবাজি, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাব বিস্তারের মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, বারুইপাড়া বিটের বারুইপাড়া মৌজার এসএ ১৭১১ ও আরএস ৩৭৪৯ নম্বর দাগভুক্ত প্রায় ছয় একর সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে সেখানে 'খাসপাড়া' নামে একটি অবৈধ বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই এলাকায় অপরাধচক্রের সদস্যদের বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং সেখানে নিয়মিত মাদক ও জুয়ার আসর বসে।
এছাড়া বারুইপাড়া মৌজার এক নম্বর খাস খতিয়ানের আরএস ৪২৯৮ নম্বর দাগের প্রায় ১২৫ শতাংশ সরকারি জমিতে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ করে প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের ভাড়া আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, রাজেন্দ্রপুর পশ্চিম বিটের আওতায় আল-আকসা মসজিদসংলগ্ন সংরক্ষিত বনভূমির বিভিন্ন অংশ দখল করে ঘর নির্মাণের সুযোগ করে দেওয়ার নামে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়েছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও বন বিভাগের ডিমারকেশনকে কেন্দ্র করে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে রাসেলের বিরুদ্ধে।
'রাজনৈতিক প্রভাবে গড়ে উঠেছে দখলচক্র'
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ উপার্জন করা হয়। সেই অর্থের প্রভাবে মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং জমি দখলের একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে ওঠে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আরাফাত রহমান রাসেল একসময় জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে পরিচিত।
বন বিভাগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অতীতেও বন আইনে রাসেলের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বারুইপাড়া ও রাজেন্দ্রপুর পশ্চিম বিটের কিছু অসাধু বন কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে বনভূমি দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং অর্থ লেনদেনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে।
প্রশাসনের বক্তব্য
সরকারি খাসজমি দখলের বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. সোহেল রানা বলেন, সম্প্রতি দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত প্রতিবেদন প্রশাসনের নজরে এসেছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসক অবগত আছেন এবং অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংরক্ষিত বনভূমি দখলের অভিযোগ সম্পর্কে ঢাকা বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন সংরক্ষক (সিএফ) মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারী বলেন, অভিযোগের বিষয়ে তারা তথ্য পেয়েছেন। শিগগিরই সরেজমিন তদন্ত করে দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তদন্তে বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে আরাফাত রহমান রাসেলের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে সাংবাদিকের ওপর হামলা, হত্যার হুমকি এবং সরকারি খাসজমি ও সংরক্ষিত বনভূমি দখলের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক, সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ও পরিবেশ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।