ঢাকা    সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
ভিশন বাংলা ২৪

দিনমজুর থেকে রণাঙ্গনের বীর

পাঁচ দশকেও মেলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, কষ্টে দিন কাটছে বীর মুক্তিযোদ্ধা ‘খোকা’র


তুহিন ভূঁইয়া
তুহিন ভূঁইয়া

পাঁচ দশকেও মেলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, কষ্টে দিন কাটছে বীর মুক্তিযোদ্ধা ‘খোকা’র

১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে দেশমাতৃকার ডাকে নিজের দিনমজুরের জীবন ফেলে অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মোঃ ইসহাক, যাকে সবাই চেনেন ‘খোকা’ নামে। দেখতে অত্যন্ত সহজ-সরল ও সাদাসিধে গড়নের হওয়ায় গেরিলা দলে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অনন্য। সহযোদ্ধাদের মধ্যে বেশিরভাগই উচ্চবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত তরুণ হওয়ায় অস্ত্র-গোলাবারুদ পরিবহন এবং গোপন তথ্য আদান-প্রদানের মতো জটিল ও বিপজ্জনক কাজের গুরুদায়িত্ব অবলীলায় কাঁধে তুলে নিতেন তিনি। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বীরের মর্যাদা না খুঁজে পরিবারের মুখে অন্ন জোগাতে তিনি আবারও ফিরে যান সেই দিনমজুরের পেশায়। আর সেই নীরব ত্যাগ ও জীবনসংগ্রামের কারণেই সবার মতো সময়ে নিজের নামটি সরকারি তালিকায় তুলতে পারেননি তিনি। দীর্ঘ পাঁচ দশক পর আজ ৭৩ বছর বয়সে পাঁচ সন্তান নিয়ে চরম আর্থিক অনটন আর অভাব-অনটনে কাটছে এই সম্মুখযোদ্ধার দিন।   

মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থানার হাসার গাঁও গ্রামের সন্তান মোঃ ইসহাক বর্তমানে রাজধানীর সূত্রাপুরের গেণ্ডারিয়ার ১৫/১, সত্যেন্দ্র কুমার দাস রোডের জীর্ণ ঠিকানায় বসবাস করছেন। পিতা মৃত ইমতিয়াজ উদ্দিন ও মাতা করিমন নেসার সন্তান ইসহাকের জন্ম ১৯৫৩ সালের ১ জানুয়ারি। একাত্তরে পরিবারের মায়া ত্যাগ করে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের আসামের ওম্পি ট্রেনিং ক্যাম্পে (প্রথম ব্যাচ) সুবেদার সেকেন্দারের অধীনে কঠোর অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেন তিনি। পরবর্তীতে ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে থেকে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি কমান্ডার মোসাদ্দেক আলী বাবলার অধীনে ডেমরা তারাকপুর ক্যাম্পিংসহ একাধিক রক্তক্ষয়ী সম্মুখ সমরে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেন। স্বাধীনতা অর্জনের পর ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে নিজের অস্ত্র সমর্পণ করেছিলেন এই বীর সেনানী।   অভাবের তাড়নায় দীর্ঘকাল স্বীকৃতির আবেদন করতে না পারলেও পরবর্তীতে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় তালিকার জন্য ২০১৫ সালে রাজধানীর সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠিত যাচাই-বাছাই কমিটির কাছে প্রয়োজনীয় ৩৩ পাতার দালিলিক প্রমাণাদি জমা দেন মোঃ ইসহাক। সেখানে কমিটির সামনে তিনি নিজে এবং তাঁর প্রখ্যাত যুদ্ধকালীন সহযোদ্ধারা সশরীরে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য ও প্রত্যয়ন প্রদান করেন। তাঁর সহযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন লাল মুক্তিবার্তা তালিকাভুক্ত ও গেজেটধারী বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ রেজাউর রহমান (গেজেট নং- ১৫৯, লাল মুক্তিবার্তা নং- ১৮৯), মোসাদ্দেক আলী বাবলা (গেজেট নং- ভারতীয় সমমঞ্চ লাল-৪৪৯) এবং ফজলুল করিম আলমগীর (গেজেট নং- ঢাকা সেক্টর নং-১৮৭), ছাড়াও সহযোদ্ধা হান্নান ও সরোয়ার। যাচাই কমিটি তাঁর সকল কাগজপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ দেখে তিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিশ্চিত করে এবং দ্রুততম সময়ে গেজেটভুক্তির আশ্বাস দেয়।   এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়েও দুই দফায় অনুষ্ঠিত নানা তথ্যপ্রমাণ যাচাই-বাছাই কার্যক্রমে শতভাগ উত্তীর্ণ হন মোঃ ইসহাক। 

এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টসহ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে রেজিস্ট্রি ডাকযোগেও যাবতীয় কাগজপত্র পাঠানো হয়। কিন্তু বৈশ্বিক করোনা মহামারী শুরু হলে সব কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়াটি লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে থমকে যায়।   বর্তমানে বাদ পড়া প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন করে তালিকাভুক্তির সুযোগ তৈরি হওয়ায় মোঃ ইসহাক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পুনরায় আবেদন জানিয়েছেন। পাঁচ সন্তান নিয়ে আজ বয়সের ভার ও অভাব-অনটনে জর্জরিত এই বীর মুক্তিযোদ্ধার একমাত্র চাওয়া—জীবন সায়াহ্নে এসে যেন কাঙ্ক্ষিত গেজেটভুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিটুকু তিনি পান। গেজেটভুক্তি সম্পন্ন হলে সরকারের দেওয়া সুযোগ-সুবিধায় শেষ ক'টা দিন অন্তত একটু খেয়ে-পরে স্বাচ্ছন্দ্যে কাটিয়ে যেতে পারতেন এই নিঃস্বার্থ যোদ্ধা।

ভিশন বাংলা ২৪

সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬


পাঁচ দশকেও মেলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, কষ্টে দিন কাটছে বীর মুক্তিযোদ্ধা ‘খোকা’র

প্রকাশের তারিখ : ১২ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে দেশমাতৃকার ডাকে নিজের দিনমজুরের জীবন ফেলে অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মোঃ ইসহাক, যাকে সবাই চেনেন ‘খোকা’ নামে। দেখতে অত্যন্ত সহজ-সরল ও সাদাসিধে গড়নের হওয়ায় গেরিলা দলে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অনন্য। সহযোদ্ধাদের মধ্যে বেশিরভাগই উচ্চবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত তরুণ হওয়ায় অস্ত্র-গোলাবারুদ পরিবহন এবং গোপন তথ্য আদান-প্রদানের মতো জটিল ও বিপজ্জনক কাজের গুরুদায়িত্ব অবলীলায় কাঁধে তুলে নিতেন তিনি। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বীরের মর্যাদা না খুঁজে পরিবারের মুখে অন্ন জোগাতে তিনি আবারও ফিরে যান সেই দিনমজুরের পেশায়। আর সেই নীরব ত্যাগ ও জীবনসংগ্রামের কারণেই সবার মতো সময়ে নিজের নামটি সরকারি তালিকায় তুলতে পারেননি তিনি। দীর্ঘ পাঁচ দশক পর আজ ৭৩ বছর বয়সে পাঁচ সন্তান নিয়ে চরম আর্থিক অনটন আর অভাব-অনটনে কাটছে এই সম্মুখযোদ্ধার দিন।   

মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থানার হাসার গাঁও গ্রামের সন্তান মোঃ ইসহাক বর্তমানে রাজধানীর সূত্রাপুরের গেণ্ডারিয়ার ১৫/১, সত্যেন্দ্র কুমার দাস রোডের জীর্ণ ঠিকানায় বসবাস করছেন। পিতা মৃত ইমতিয়াজ উদ্দিন ও মাতা করিমন নেসার সন্তান ইসহাকের জন্ম ১৯৫৩ সালের ১ জানুয়ারি। একাত্তরে পরিবারের মায়া ত্যাগ করে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের আসামের ওম্পি ট্রেনিং ক্যাম্পে (প্রথম ব্যাচ) সুবেদার সেকেন্দারের অধীনে কঠোর অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেন তিনি। পরবর্তীতে ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে থেকে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি কমান্ডার মোসাদ্দেক আলী বাবলার অধীনে ডেমরা তারাকপুর ক্যাম্পিংসহ একাধিক রক্তক্ষয়ী সম্মুখ সমরে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেন। স্বাধীনতা অর্জনের পর ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে নিজের অস্ত্র সমর্পণ করেছিলেন এই বীর সেনানী।   অভাবের তাড়নায় দীর্ঘকাল স্বীকৃতির আবেদন করতে না পারলেও পরবর্তীতে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় তালিকার জন্য ২০১৫ সালে রাজধানীর সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠিত যাচাই-বাছাই কমিটির কাছে প্রয়োজনীয় ৩৩ পাতার দালিলিক প্রমাণাদি জমা দেন মোঃ ইসহাক। সেখানে কমিটির সামনে তিনি নিজে এবং তাঁর প্রখ্যাত যুদ্ধকালীন সহযোদ্ধারা সশরীরে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য ও প্রত্যয়ন প্রদান করেন। তাঁর সহযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন লাল মুক্তিবার্তা তালিকাভুক্ত ও গেজেটধারী বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ রেজাউর রহমান (গেজেট নং- ১৫৯, লাল মুক্তিবার্তা নং- ১৮৯), মোসাদ্দেক আলী বাবলা (গেজেট নং- ভারতীয় সমমঞ্চ লাল-৪৪৯) এবং ফজলুল করিম আলমগীর (গেজেট নং- ঢাকা সেক্টর নং-১৮৭), ছাড়াও সহযোদ্ধা হান্নান ও সরোয়ার। যাচাই কমিটি তাঁর সকল কাগজপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ দেখে তিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিশ্চিত করে এবং দ্রুততম সময়ে গেজেটভুক্তির আশ্বাস দেয়।   এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়েও দুই দফায় অনুষ্ঠিত নানা তথ্যপ্রমাণ যাচাই-বাছাই কার্যক্রমে শতভাগ উত্তীর্ণ হন মোঃ ইসহাক। 

এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টসহ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে রেজিস্ট্রি ডাকযোগেও যাবতীয় কাগজপত্র পাঠানো হয়। কিন্তু বৈশ্বিক করোনা মহামারী শুরু হলে সব কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়াটি লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে থমকে যায়।   বর্তমানে বাদ পড়া প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন করে তালিকাভুক্তির সুযোগ তৈরি হওয়ায় মোঃ ইসহাক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পুনরায় আবেদন জানিয়েছেন। পাঁচ সন্তান নিয়ে আজ বয়সের ভার ও অভাব-অনটনে জর্জরিত এই বীর মুক্তিযোদ্ধার একমাত্র চাওয়া—জীবন সায়াহ্নে এসে যেন কাঙ্ক্ষিত গেজেটভুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিটুকু তিনি পান। গেজেটভুক্তি সম্পন্ন হলে সরকারের দেওয়া সুযোগ-সুবিধায় শেষ ক'টা দিন অন্তত একটু খেয়ে-পরে স্বাচ্ছন্দ্যে কাটিয়ে যেতে পারতেন এই নিঃস্বার্থ যোদ্ধা।



ভিশন বাংলা ২৪

Advisory Editor: Syed Shajahan Saju, Adviser: Advocate Shajan Majumder, Chief Editor: Tuhin Bhuiyan, Executive Editor: S.M. Kamal, Managing Editor: Bayzid Bostami, Asst. Editor: Sahara Moon, Asst. Editor: Azgar Ali
কপিরাইট © ২০২৬ ভিশন বাংলা ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত