শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাষকদের পদোন্নতি
দ্রুত সরকারি আদেশ (জিও) জারির আকুল আহ্বান
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের অন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক আলোকবর্তিকা হলো বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার। ১৯৮০ সালে ক্যাডার কম্পোজিশন রুলস বলবৎ হওয়ার পর থেকে অদ্যবধি প্রশাসনিক সংস্কার, মেধাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ এবং জাতিগঠনের প্রতিটি বাঁকে এই ক্যাডারের সদস্যগণ অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছেন। একটি আধুনিক ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের মূল ভিত্তিই হলো মানসম্মত শিক্ষা, আর সেই মানসম্মত শিক্ষার প্রাণপুরুষ হলেন উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় নিবেদিত এই শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাবৃন্দ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সরকারি কলেজসমূহে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে মানসম্মত পাঠদান, গবেষণা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষায় রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভাগীয় ও জেলা শহরের প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত ক্যাডারের কর্মকর্তাগণ অত্যন্ত দক্ষতা ও আন্তরিকতার সাথে আলোক প্রজ্জ্বলন করে যাচ্ছেন।
বর্তমানে মাঠে ৪৯তম বিসিএস ব্যাচ পর্যন্ত কর্মকর্তাবৃন্দ নিষ্ঠার সাথে কার্যরত আছেন। ৪৯তম বিসিএস বিশেষ বিসিএস হওয়ায় ৪৫, ৪৬ ও ৪৭তম বিসিএসের নতুন মুখগুলো এখনো সরাসরি শিক্ষাঙ্গনে যুক্ত হতে পারেননি, তবে মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে ৪৫তম বিসিএসের গেজেট প্রকাশিত হওয়ায় অচিরেই তাঁরা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবেন। এর ফলে দেখা যাচ্ছে, মাঠে কর্মরত সর্বনিম্ন ব্যাচ (৪৯তম)-এর সাথে ৩৬তম বিসিএসের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ১৩ ব্যাচ এবং নবাগত ৪৫তম ব্যাচের সঙ্গে ব্যবধান ৯ ব্যাচ। অথচ এক চরম ও অভূতপূর্ব প্রশাসনিক বৈষম্যের চিত্র ফুটে ওঠে যখন দেখা যায়—৩৬ থেকে ৪৫তম ও ৪৯তম ব্যাচের সকল যোগ্য কর্মকর্তা ব্যাচভিত্তিক এতো বিস্তর ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও একই পদমর্যাদায়, সমান্তরালভাবে ‘প্রভাষক’ পদের শৃঙ্খলে বন্দি রয়েছেন।
এমন স্থবিরতা কাটিয়ে শিক্ষা প্রশাসনে গতিশীলতা আনয়ন এবং প্রভাষকদের পদোন্নতি প্রক্রিয়া সুগম করতে গত ১৬, ১৭ ও ২১ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পদোন্নতি সংক্রান্ত কমিটির (ডিপিসি) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু দীর্ঘ আলোচনার পর ডিপিসি সম্পন্ন হলেও অদ্যাবধি কাঙ্ক্ষিত সরকারি আদেশ (জিও) জারি না হওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক। প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত সকল শর্ত পূরণ করা সত্ত্বেও ৩৬ থেকে ৩৮তম বিসিএসের প্রায় দেড় সহস্রাধিক মেধাবী কর্মকর্তা আজ চাতক পাখির ন্যায় মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের পানে চেয়ে আছেন। ৩৬তম বিসিএস আজ কর্মজীবনের নবম বর্ষে, ৩৭তম বিসিএস অষ্টম বর্ষে এবং ৩৮তম বিসিএস ষষ্ঠ বর্ষে পদার্পণ করেছে। পক্ষান্তরে, সমসাময়িক অন্যান্য ক্যাডারের ৩৮তম ব্যাচ পর্যন্ত প্রায় সকল কর্মকর্তা পদোন্নতি লাভ করে উচ্চতর প্রশাসনিক দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। কেবল শিক্ষা ক্যাডারের ভাগ্যে জমেছে এই অনাকাঙ্ক্ষিত বৈষম্য ও দীর্ঘসূত্রতার মেঘ।
পদোন্নতি কেবল অর্থনৈতিক প্রাপ্তি নয়; এটি মেধার স্বীকৃতি, কর্মপ্রেরণার উৎস এবং পেশাগত আত্মমর্যাদার প্রধান নিয়ামক। টানা তিন কার্যদিবস ডিপিসির দীর্ঘ পর্যালোচনার পর জিও জারিতে এমন অহেতুক বিলম্ব ইতিপূর্বে কখনোই দৃষ্ট হয়নি, যা যোগ্য কর্মকর্তাদের মনে গভীর হতাশা ও পুঞ্জীভূত ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে।
বর্তমান সরকার তাঁদের জনবান্ধব অঙ্গীকার ও রাষ্ট্র পরিচালনায় শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষক সমাজের মর্যাদারক্ষায় বৈষম্য দূরীকরণ এবং একটি গতিশীল শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সরকারের রূপকল্পেরই অংশ। তবে জুনিয়র পর্যায়ের শিক্ষকদের অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে কিংবা পদোন্নতির পথ রুদ্ধ রেখে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্নাবেশ বাস্তবে রূপ নেওয়া অসম্ভব।
দীর্ঘদিন পদোন্নতিবঞ্চিত এই কর্মকর্তাবৃন্দ প্রতিদিন এক নীরব মনস্তাত্ত্বিক যাতনা বহন করছেন। সমসাময়িক অন্য ক্যাডারের সহকর্মীরা যখন নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে অবদান রাখছেন, তখন শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতিবঞ্চিত সদস্যগণ সামাজিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে আত্মমর্যাদার সংকটে ভুগছেন। এই গ্লানিকর অবস্থার অবসান ঘটিয়ে তাঁদের প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া বর্তমান সরকারের শিক্ষাবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গির সাথেই গভীর সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অতএব, আমাদের বিনীত ও আকুল নিবেদন— সদ্য সমাপ্ত ডিপিসির সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনার আলোকে পদোন্নতির সরকারি আদেশ (জিও) অনতিবিলম্বে জারির জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে এই যোগ্য কর্মকর্তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিলে তাঁদের কর্মস্পৃহা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং সমগ্র শিক্ষা প্রশাসনে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারকগণ মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করে দ্রুত জিও জারি নিশ্চিত করবেন—এটাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের মেধাবী ও যোগ্য কর্মকর্তাদের মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা সম্ভব। মেধা ও শিক্ষার অবমূল্যায়ন করে কোনো জাতি স্বমহিমায় ভাস্বর হতে পারে না; শিক্ষা ক্যাডারকে গতিশীল ও বৈষম্যহীন করার মধ্য দিয়েই একটি সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব হবে।
মো. মেহেদী হাসান
প্রভাষক, রসায়ন বিভাগ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ