গ্রেপ্তার ৪ পুলিশ সদস্য
সরকারি ই-মেইল ও ভুয়া জিডি-মামলা ব্যবহার করে সিডিআর বিক্রি
সরকারি ই-মেইল এবং ভুয়া সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও মামলার নম্বর ব্যবহার করে নাগরিকদের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য এবং অন্যান্য গোপনীয় তথ্য সংগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে পুলিশের চার সদস্যের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তাঁদের গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার বিভাগ। সরকারি ক্ষমতা ও দাপ্তরিক পরিচয়ের অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং তা অর্থের বিনিময়ে সরবরাহের অভিযোগটি নাগরিকদের তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন ডেমরা থানার পুলিশ কনস্টেবল সাইমন হোসেন রাশেদ ও মাসুম মিয়া, ওয়ারী থানার কনস্টেবল নিজাম উদ্দীন এবং তুরাগ থানার কনস্টেবল মো. জিহাদ মিয়া। তাঁদের বিরুদ্ধে সরকারি দাপ্তরিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে মোবাইল ফোনের সিডিআর সংগ্রহ এবং এসব তথ্য বিক্রি ও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ সেপ্টেম্বর ডিবির উপপরিদর্শক (এসআই) আবিদুর রহমান বাদী হয়ে রাজধানীর রমনা থানায় মামলা করেন। মামলায় অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১ এবং বাংলাদেশ দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারার উল্লেখ রয়েছে। বর্তমানে মামলাটি ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম উত্তর বিভাগ তদন্ত করছে।
এজাহারে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা সরকারি কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও প্রতারণার মাধ্যমে বেআইনিভাবে বিভিন্ন মোবাইল নম্বরের কল ডিটেইল রেকর্ড সংগ্রহ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব রেকর্ডে কলের বিবরণ ও সংশ্লিষ্ট তথ্যের পাশাপাশি সর্বশেষ কলের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের বিষয়টিও তদন্তে এসেছে। এ ছাড়া নাগরিকদের এনআইডি-সংক্রান্ত তথ্যসহ বিভিন্ন গোপনীয় উপাত্ত সংগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্রি ও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁদের বিরুদ্ধে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত ১০ সেপ্টেম্বর ডিবির সাইবার মনিটরিং কার্যক্রমে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপে সিডিআর বিক্রির বিষয়টি নজরে আসে। পরে এ বিষয়ে তথ্য যাচাই ও অনুসন্ধান শুরু করেন গোয়েন্দারা। মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনের তথ্য এবং বিকাশের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে এ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে চার পুলিশ সদস্যকে শনাক্ত করা হয়।
তদন্তে তুরাগ থানার কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কনস্টেবল মো. জিহাদ মিয়ার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, তিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে ভুয়া জিডি নম্বর এবং একজন সহকারী উপপরিদর্শকের (এএসআই) নাম উল্লেখ করে ১১টি মোবাইল নম্বরের সিডিআর সংগ্রহ করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি দাপ্তরিক পরিচয় ব্যবহার করে এভাবে তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
অন্যদিকে, ডেমরা ও ওয়ারী থানার ওসিদের সরকারি ই-মেইল এবং ভুয়া মামলার নম্বর ব্যবহার করে কনস্টেবল সাইমন হোসেন রাশেদ, মাসুম মিয়া ও নিজাম উদ্দীন সিডিআর সংগ্রহ করতেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পরে এসব তথ্য বিভিন্ন ব্যক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি অর্থ গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। তবে এসব তথ্য কারা কিনেছেন, কতজন নাগরিকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কত টাকার বিনিময়ে তা বিক্রি করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, অভিযুক্ত চার পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সিডিআর, অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য ও এনআইডির উপাত্ত অননুমোদিত ব্যক্তির হাতে পৌঁছালে তা প্রতারণা, হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল কিংবা অন্যান্য অপরাধে ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সরকারি ই-মেইল ও ভুয়া নথি ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ দাপ্তরিক অনুমোদন যাচাই এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এ ঘটনায় তদন্তের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের প্রকৃত পরিধি, সম্ভাব্য ক্রেতা, অর্থ লেনদেনের পরিমাণ এবং অন্য কেউ জড়িত কি না, তা নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি ই-মেইল ব্যবহারের অনুমোদন, তথ্য সরবরাহের প্রক্রিয়া এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো দুর্বলতা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে।