ডিএনসিসিতে ৫০ জনের অবৈধ আত্তীকরণ
জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পদোন্নতির অভিযোগ
নিয়ম লঙ্ঘন করে ৫০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আত্তীকরণ ও পদোন্নতি দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। শুধু আত্তীকরণই নয়, যোগ্যতার মানদণ্ড উপেক্ষা করে অনেককে বাড়তি পদোন্নতি ও অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। সম্প্রতি সরকারের অডিট বিভাগ বিষয়টি সামনে আনলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জানা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর একই দিনে বিভিন্ন পদে ৫০ জনকে আত্তীকরণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় আওয়ামী লীগ আমলে পদায়ন পাওয়া কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা সংঘবদ্ধভাবে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন। এমনকি ‘মব’ বা চাপের ভয় দেখিয়ে অনেকটা জোরপূর্বক এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এ-সংক্রান্ত অফিস স্মারকটি করপোরেশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়নি।
সম্প্রতি অডিট বিভাগ ডিএনসিসিতে পরিদর্শনে গিয়ে আত্তীকরণ-সংক্রান্ত নথি চাইলে কর্তৃপক্ষ কোনো স্মারক দেখাতে পারেনি। স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমোদনের নথিও দেখানো সম্ভব হয়নি। অনুসন্ধানে জানা যায়, আত্তীকরণের অনুমতি চেয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে কোনো নথিই পাঠানো হয়নি।
ডিএনসিসির কর্মকর্তারা জানান, ২০১৭ সালে দুই সিটি করপোরেশনের নতুন অর্গানোগ্রাম প্রণয়নের পর বহু পদ বিলুপ্ত হয়। এতে অনেকে পদশূন্য হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তাদের বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করা হয়। তবে স্থায়ীভাবে আত্তীকরণের জন্য নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। জনপ্রশাসন-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির অনুমোদনের পর স্থানীয় সরকার বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং সর্বশেষ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়ার নিয়ম।
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২১ সালের ৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত করপোরেশনের নবম সভায় ৭৫ জনকে আত্তীকরণের বিষয়ে ইতিবাচক মত দেওয়া হয়েছিল। তবে শূন্য পদে নিয়োগ এবং পদ না থাকলে এক গ্রেড নিচের পদে দায়িত্ব দেওয়ার শর্ত ছিল। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার বিভাগকে অবহিত করার সিদ্ধান্তও ছিল। কিন্তু এবার এসব নিয়মের কোনো কিছুই মানা হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, আত্তীকরণের পর যন্ত্রচালক কাজী আলমগীর হোসেনকে প্রথমে হিসাব সহকারী এবং একই দিনে আরেক আদেশে রাজস্ব পরিদর্শক করা হয়। পরে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় অঞ্চল-৩-এর রাজস্ব পরিদর্শকের। অথচ এ পদে দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁর চেয়ে জ্যেষ্ঠ অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা রয়েছেন।
একইভাবে ডিজ ইনফেকশন পরিদর্শক আব্দুল খালেক মজুমদারকে ব্যক্তিগত সহকারী করার পর অঞ্চল-৪-এর স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও সহকারী সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিল সহকারী মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে রেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট করার পর অঞ্চল-১-এর বাজার সুপারভাইজারের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। আত্তীকরণ হওয়া ৫০ জনের মধ্যে মাত্র তিনজন ছাড়া প্রায় সবার ক্ষেত্রেই এমন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
ওই সময় ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন অতিরিক্ত সচিব মীর খায়রুল আলম এবং সচিব ছিলেন মাসুদ আলম সিদ্দিক। বর্তমানে খায়রুল আলম অবসরে গেছেন এবং মাসুদ আলম সিদ্দিক ওএসডি হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত আছেন। অভিযোগ প্রসঙ্গে মাসুদ আলম সিদ্দিক কথা বলতে রাজি হননি। তবে মীর খায়রুল আলম বলেন, “ওই সময় বিভিন্ন গ্রুপ নানা দাবি নিয়ে আসত। তবে নিয়মের ব্যত্যয় হয়েছে বলে মনে পড়ে না।”
ডিএনসিসির ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, “তখন আমি দায়িত্বে ছিলাম না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।”
অডিটে ওঠে আসা এসব অনিয়মের ঘটনায় ডিএনসিসির প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের অনিয়ম আরও বাড়বে।