ঢাকা    শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬
ভিশন বাংলা ২৪

স্বৈরাচারের দোসর এসআই আরাফাত হাসান এখনো বহাল তবিয়তে


বিশেষ প্রতিনিধি:
বিশেষ প্রতিনিধি:

স্বৈরাচারের দোসর এসআই আরাফাত হাসান এখনো বহাল তবিয়তে

বরিশালের কোতয়ালি মডেল থানায় দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিরোধী মতের নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন, চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং নারী হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) আরাফাত হাসানের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বিগত স্বৈরাচার সরকারের সময় আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত এই পুলিশ সদস্য এখনও বহাল তবিয়তে চাকরিতে রয়েছেন এবং বিভিন্ন থানায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বরিশাল অঞ্চলে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের কাছে একসময় আতঙ্কের নাম ছিল এসআই আরাফাত হাসান। অভিযোগ রয়েছে, বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের লোকজনকে বাড়িতে থাকতে না দেওয়া, থানায় ডেকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, মাদক ও অস্ত্র মামলার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং রাজনৈতিক হয়রানির মাধ্যমে তিনি একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তোলেন।

স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, পুলিশের চাকরিতে যোগদানের পর অস্বাভাবিকভাবে সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন আরাফাত হাসান। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষ-বাণিজ্য ও বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। সূত্রগুলো জানিয়েছে, তার নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর রয়েছে। এছাড়া নিজ জেলা ভোলার মনপুরা উপজেলায়ও গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদ।

অভিযোগ রয়েছে, বরিশাল কোতয়ালি মডেল থানায় কর্মরত থাকাকালে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীকে আসামি করার ভয় দেখিয়ে বিপুল অর্থ আদায় করতেন তিনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, থানায় একাধিক ওসি বদলি হলেও আরাফাত হাসান সবসময় প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন এবং কার্যত থানার নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশে তার হাতেই ছিল।

তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্টেও আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। একটি পোস্টে তিনি ভোলা-৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অন্য একটি পোস্টে আওয়ামী লীগ নেতা মোশারেফ হোসেন মজনু ফরাজীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কামনা করেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা ছিল তার নিয়মিত কর্মকাণ্ডের অংশ। একাধিক ব্যক্তি দাবি করেছেন, মাদক ও অস্ত্র মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হতো। এমনকি স্থানীয় এক ওসির সঙ্গে যোগসাজশে জমি দখল করে ভাগ-বাটোয়ারার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে থানাভিত্তিক একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন আরাফাত হাসান। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও প্রভাবশালী মহলের সমর্থনের কারণে দীর্ঘদিনেও তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এদিকে নারী হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, থানায় বিভিন্ন প্রয়োজনে আসা নারী ও যুবতীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়া হতো। কিছু ক্ষেত্রে তাদের আবাসিক হোটেলে নিয়ে যৌন নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। তবে সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তার শঙ্কায় ভুক্তভোগীরা প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পরও এসআই আরাফাত হাসান বিভিন্ন থানায় দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। পটুয়াখালী, বাকেরগঞ্জ ও মেহেন্দীগঞ্জে কর্মরত থাকার পর বর্তমানে তিনি বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার লবণসাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে।

তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এসআই আরাফাত হাসান। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, “জমি দখলের অভিযোগ সঠিক নয়। ওই জমি আমার শ্বশুর কিনেছেন এবং সেখানে বাড়ি করেছেন। অন্যান্য অভিযোগও মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।”

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এসআই আরাফাত হাসানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হলে থানা-কেন্দ্রিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বহু তথ্য সামনে আসতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনের ভেতরে এখনো কোনো প্রভাবশালী চক্র বিগত সরকারের সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের পুনর্বাসন করছে কি না, সে প্রশ্নও তুলছেন অনেকে।

এই অনুসন্ধানের প্রথম পর্বে উঠে এসেছে অভিযোগ, প্রভাব ও বিতর্কের নানা দিক। দ্বিতীয় পর্বে থাকছে সম্পদের উৎস, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্তভিত্তিক অনুসন্ধান...

ভিশন বাংলা ২৪

শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬


স্বৈরাচারের দোসর এসআই আরাফাত হাসান এখনো বহাল তবিয়তে

প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬

featured Image

বরিশালের কোতয়ালি মডেল থানায় দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিরোধী মতের নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন, চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং নারী হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) আরাফাত হাসানের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বিগত স্বৈরাচার সরকারের সময় আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত এই পুলিশ সদস্য এখনও বহাল তবিয়তে চাকরিতে রয়েছেন এবং বিভিন্ন থানায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বরিশাল অঞ্চলে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের কাছে একসময় আতঙ্কের নাম ছিল এসআই আরাফাত হাসান। অভিযোগ রয়েছে, বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের লোকজনকে বাড়িতে থাকতে না দেওয়া, থানায় ডেকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, মাদক ও অস্ত্র মামলার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং রাজনৈতিক হয়রানির মাধ্যমে তিনি একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তোলেন।

স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, পুলিশের চাকরিতে যোগদানের পর অস্বাভাবিকভাবে সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন আরাফাত হাসান। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষ-বাণিজ্য ও বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। সূত্রগুলো জানিয়েছে, তার নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর রয়েছে। এছাড়া নিজ জেলা ভোলার মনপুরা উপজেলায়ও গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদ।

অভিযোগ রয়েছে, বরিশাল কোতয়ালি মডেল থানায় কর্মরত থাকাকালে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীকে আসামি করার ভয় দেখিয়ে বিপুল অর্থ আদায় করতেন তিনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, থানায় একাধিক ওসি বদলি হলেও আরাফাত হাসান সবসময় প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন এবং কার্যত থানার নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশে তার হাতেই ছিল।

তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্টেও আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। একটি পোস্টে তিনি ভোলা-৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অন্য একটি পোস্টে আওয়ামী লীগ নেতা মোশারেফ হোসেন মজনু ফরাজীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কামনা করেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা ছিল তার নিয়মিত কর্মকাণ্ডের অংশ। একাধিক ব্যক্তি দাবি করেছেন, মাদক ও অস্ত্র মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হতো। এমনকি স্থানীয় এক ওসির সঙ্গে যোগসাজশে জমি দখল করে ভাগ-বাটোয়ারার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে থানাভিত্তিক একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন আরাফাত হাসান। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও প্রভাবশালী মহলের সমর্থনের কারণে দীর্ঘদিনেও তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এদিকে নারী হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, থানায় বিভিন্ন প্রয়োজনে আসা নারী ও যুবতীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়া হতো। কিছু ক্ষেত্রে তাদের আবাসিক হোটেলে নিয়ে যৌন নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। তবে সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তার শঙ্কায় ভুক্তভোগীরা প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পরও এসআই আরাফাত হাসান বিভিন্ন থানায় দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। পটুয়াখালী, বাকেরগঞ্জ ও মেহেন্দীগঞ্জে কর্মরত থাকার পর বর্তমানে তিনি বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার লবণসাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে।

তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এসআই আরাফাত হাসান। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, “জমি দখলের অভিযোগ সঠিক নয়। ওই জমি আমার শ্বশুর কিনেছেন এবং সেখানে বাড়ি করেছেন। অন্যান্য অভিযোগও মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।”

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এসআই আরাফাত হাসানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হলে থানা-কেন্দ্রিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বহু তথ্য সামনে আসতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনের ভেতরে এখনো কোনো প্রভাবশালী চক্র বিগত সরকারের সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের পুনর্বাসন করছে কি না, সে প্রশ্নও তুলছেন অনেকে।

এই অনুসন্ধানের প্রথম পর্বে উঠে এসেছে অভিযোগ, প্রভাব ও বিতর্কের নানা দিক। দ্বিতীয় পর্বে থাকছে সম্পদের উৎস, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্তভিত্তিক অনুসন্ধান...


ভিশন বাংলা ২৪

Advisory Editor: Syed Shajahan Saju, Adviser: Advocate Shajan Majumder, Chief Editor: Tuhin Bhuiyan, Executive Editor: S.M. Kamal, Managing Editor: Bayzid Bostami, Asst. Editor: Sahara Moon, Asst. Editor: Azgar Ali
কপিরাইট © ২০২৬ ভিশন বাংলা ২৪ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত