পুলিশ সুপারের কাছে ভুক্তভোগীর কান্না
নরসিংদীতে মা-মেয়ের বিরুদ্ধে ৭ ভরি স্বর্ণ ও ডায়মন্ড আত্মসাতের অভিযোগ
মানুষের ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাস কি তবে চিরতরে উঠে যাবে? সরল বিশ্বাস আর প্রতিবেশীর প্রতি পরম আস্থাই যেন কাল হলো নরসিংদীর রাবেয়া আক্তার ঋতুর জীবনে। বিশ্বাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক চরম সুপরিকল্পিত ও নির্মম প্রতারণার শিকার হয়ে জীবনের সমস্ত সঞ্চয়—প্রায় ৭ ভরি স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান ডায়মন্ডের গহনা হারিয়ে আজ তিনি নিঃস্ব। আমানত হিসেবে গচ্ছিত রাখা নিজের শেষ সম্বলটুকু ফেরত চাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো মিলেছে শূন্য ব্যাগ আর চুরির ঘটনা ধামাচাপা দিতে প্রাণনাশের হুমকি। নরসিংদীর শিবপুর থানার ইটাতলা এলাকার এক মা ও মেয়ের এমন অমানবিক ও নিষ্ঠুর জালিয়াতির বিরুদ্ধে গত ১৫ জুন ২০২৬ তারিখে নরসিংদীর পুলিশ সুপারের (এসপি) নিকট একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন অশ্রুসিক্ত ভুক্তভোগী ওই নারী।
অভিযোগের মর্মস্পর্শী বিবরণ থেকে জানা যায়, গত ১০ জুন ২০২৬ ইং তারিখ বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে ভুক্তভোগী রাবেয়া আক্তার ঋতু শিবপুরের ইটাতলাস্থ তাঁর পূর্বপরিচিত ফেরদৌসী বেগমের বাসায় বেড়াতে যান। সেখানে অবস্থানকালে আপনজন ভেবে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি তাঁর সাথে থাকা একটি ব্যাগে ভর্তি মূল্যবান স্বর্ণালংকার ও ডায়মন্ডের গহনা আমানত হিসেবে ফেরদৌসী বেগমের জিম্মায় রাখেন। কিন্তু কে জানত, সেই চেনা মুখের আড়ালে লুকিয়ে ছিল লোভী আর প্রতারকের আসল চেহারা! অভিযুক্তরা হলেন—ইটাতলা এলাকার মৃত মোস্তাক মিয়ার স্ত্রী ফেরদৌসী বেগম এবং তাঁর মেয়ে নিশিতা আক্তার।
পরদিন অর্থাৎ ১১ জুন ২০২৬ ইং তারিখ রাত আনুমানিক ৮টার দিকে রাবেয়া আক্তার ঋতু যখন তাঁর গচ্ছিত অলংকারসহ ব্যাগটি ফেরত চান, তখন তাঁর পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়। ফেরদৌসী বেগম নাটকীয়ভাবে ব্যাগটি তাঁর হাতে তুলে দিলেও ভেতরে হাত দিয়ে ঋতু দেখেন—সব ফাঁকা! তাঁর বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে, ব্যাগে থাকা একটি গহনাও আর অবশিষ্ট ছিল না। চোখের সামনে নিজের জীবনের কষ্টার্জিত সম্পদ গায়েব দেখে ঋতু যখন কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং অলংকারসমূহ ফেরত দেওয়ার আকুতি জানান, তখন মুহূর্তেই বদলে যায় অভিযুক্ত মা-মেয়ের রূপ। ফেরদৌসী বেগম ও তাঁর মেয়ে নিশিতা আক্তার অলংকার ফেরত দিতে শুধু অস্বীকারই করেনি, বরং ভুক্তভোগীকে চরম অপমান করে তাড়িয়ে দেয়। এরপর থেকে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে তারা ভুক্তভোগী নারীর সাথে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে গা-ঢাকা দেয়।
লুটে নেওয়া স্বপ্নের সেই অলংকারের তালিকা: ১. স্বর্ণের নেকলেস: ৩টি (মোট ওজন ৭ ভরি)
২. স্বর্ণের কানের দুল: ৫ জোড়া
৩. ডায়মন্ডের নাকফুল: ১টি
৪. হাতের চুরি: ২টি
ভুক্তভোগী রাবেয়া আক্তার ঋতু তাঁর লিখিত অভিযোগে বুকফাটা আর্তনাদ নিয়ে উল্লেখ করেন, বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ও পরিকল্পিতভাবে তাঁর এই মূল্যবান সম্পদসমূহ আত্মসাৎ করা হয়েছে। বর্তমানে সেই সম্পদগুলো চিরতরে লোপাট করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে ওই লোভী চক্রটি। শুধু তাই নয়, এই চুরির বিষয়ে মুখ খুললে বা আইনের আশ্রয় নিলে ভুক্তভোগী ঋতুকে বিভিন্নভাবে প্রাণনাশের হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। একজন নারীর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে এভাবে সবকিছু লুটে নেওয়ার পর, সম্পূর্ণ নিরুপায় ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে তিনি অলংকারসমূহ উদ্ধার এবং এই ঘৃণ্য অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার লক্ষ্যে নরসিংদী জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের দ্বারস্থ হয়েছেন।
এ বিষয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ভুক্তভোগী রাবেয়া আক্তার ঋতু সংবাদমাধ্যমকে বলেন, "আমি কেবল সরল বিশ্বাসে আমার জীবনের পরম যত্নে গড়া অলংকারগুলো তাদের কাছে আমানত রেখেছিলাম। একটা মানুষ কীভাবে এতটা পাষাণ হতে পারে যে বিশ্বাসের বুকে এভাবে ছুরি মারল? আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমি প্রশাসনের কাছে হাত জোড় করে মিনতি করছি, আমার কষ্টের সম্পদগুলো উদ্ধার করে দিন এবং এই প্রতারকদের কঠোর শাস্তি দিন।"
বিশ্বাসের এমন নির্মম অপমৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ ও প্রতিবেশীরা এই ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলছেন, আমানতের খেয়ানতকারী এই মা-মেয়েকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা না হলে সমাজ থেকে মানুষের প্রতি মানুষের আস্থা চিরতরে হারিয়ে যাবে। ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি এখন নরসিংদীবাসীর।